"/> অন্তর্জাল
সিনেমা
গুডবাই লেনিন
-11/11/2016





'গুডবাই লেনিন!' আমার জীবনে দ্যাখা সুন্দরতম সিনেমা। আই রিপিট, আমার জীবনে দ্যাখা সুন্দরতম সিনেমা। এরচে সুন্দর কিছু আমি আর দেখি নাই, ভবিষ্যতে দেখবো, সেই সম্ভাবনাও সম্ভবত নাই।

ছবির কাহিনী শুরু হয় সমাজতান্ত্রিক পূর্ব জার্মানিতে। জার্মান ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক। দুই ভাই বোন আর তাদের মায়ের গল্প। মা ডেডিকেটেড কমিউনিস্ট। ছোটোবেলা থেকেই ভাই বোন জানে যে তাদের বাবার সাথে তাদের মায়ের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে, কারণ তাদের বাবা সাম্রাজ্যবাদের দালাল, তাই মা মতাদর্শিক কারণে স্বামীর সাথে সেপারেশনে গেছেন। এলেক্সের জীবনের স্বপ্ন হচ্ছে একজন এস্ট্রোনট হওয়া। আরিয়ানার জীবনের স্বপ্ন কি জানা যায় না।

এক সময় এলেক্স আর আরইয়ানা বড়ো হল। চারপাশের পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে, খুব দ্রুত, যে-কোনো মুহূর্তে পূর্ব জার্মানিতে সমাজতন্ত্র ফল করবে। এমন একদিন এলেক্স একটা গণতন্ত্রের দাবিতে হওয়া ডেমোন্সট্রেশনে যোগ দেয়, মিছিলের মধ্যে লারার সাথে দ্যাখা হয় তাঁর, এবং পুলিশ তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এলেক্স গ্রেপ্তার হয়। ঠিক সেই সময় এলেক্সের মা গাড়িতে করে কোথায় যেনো যাচ্ছিলেন, ছেলেকে গ্রেপ্তার হতে দেখে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন, রাস্তায় পড়ে যান। এলেক্স অবশ্য সহজেই জেল থেকে ছাড়া পায়। মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে সে হাসপাতালে যায়।

এলেক্স আর আরইয়ানাকে ডাক্তার বলেন কোনো পরিবর্তনের কথা জানতে পারলেই তাদের মায়ের স্নায়ুর ওপরে প্রচণ্ড চাপ পড়বে। এতে এলেক্স আর আরইয়ানা দিশেহারা হয়ে যায়। এতো বড়ো পরিবর্তনের কাল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানিতে আর আসে নি, এই সংবাদ কিভাবে মায়ের কাছ থেকে লুকোবে, বুঝবে পারে না।

এর ভেতরেই বার্লিনের দেয়াল ভেঙে পড়লো, পদত্যাগ করলেন এরিক হোনেকার, পরিবর্তন; অর্থাৎ পুঁজিবাদ; পশ্চিম থেকে পূর্বে এলো। আরইয়ানা পড়াশোনা ছেড়ে বার্গার কিংএ যোগ দিলো, তাতে পরিশ্রম কম, কাঁচা পয়সা বানের পানির মতো আসছে পূর্বে। এলেক্সের টিভি রিপেয়ারম্যানের চাকরি চলে গেলেও খুব দ্রুতই পশ্চিম জার্মানি থেকে আসা একটি কোম্পানিতে সে চাকরি পেলো। সে জীবনে প্রথমবারের মতো পশ্চিম জার্মানিতে গেলো। পর্নোগ্রাফি সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণা ছিলো না, পশ্চিম জার্মানিতে দেখলো রাস্তায় রাস্তায় পর্নোগ্রাফির দোকান, নারী পুরুষ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পর্নোগ্রাফি দেখছে। আরইয়ানা শুরুতে এই পরিবর্তনে খুব খুশী হয়, সমাজতন্ত্রের কালে দুই ভাইবোন যেসব জামাকাপড় পড়ে কাটিয়েছে, সেগুলোকে এখন তার কাছে পুরনো ত্যানা মনে হচ্ছে। তার ওপর তার হাজব্যাণ্ড পশ্চিম জার্মান, যে পূর্ব জার্মানদের ক্ষ্যাত মনে করে, তাদের বাসা-খাদ্যাভ্যাস-চলাফেরাও বদলে দিলো পুঁজিবাদ।

কিন্তু তাদের মা ক্রিশ্চিয়ানা যদি এসব জানতে পারেন, নির্ঘাৎ মরে যাবেন, তিনি পুঁজিবাদী পরিবর্তন কল্পনাও করতে পারেন না।

এলেক্স এর ভেতরে আরেকটা অসাধারণ আবিষ্কার করেছে। সেটা হচ্ছে লারা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মেয়ে, এবং হাসপাতালের সেবিকা, সেই হাসপাতালের যেখানে এলেক্সের মা এডমিটেড আছেন। লারা সিগ্রেট টানতে পছন্দ করে, এলেক্স আস্তে আস্তে লারার সাথে রাত জেগে গল্প করতে থাকে, এবং একসময় পরস্পরের প্রেমে পরে যায় তারা।

ক্রিশ্চিয়ানা যাতে কোনো পরিবর্তন না টের পান, এই কারণে এলেক্স একটা পরিকল্পনা করে। সে আরইয়ানার সাথে ঝগড়া করে বাসাকে আগের রূপে নিয়ে যায়, মার ঘরে বুক শেলফে মার্কসবাদী বইপত্র রাখে আর দেয়ালে চের ছবি টানায়, এবং কিছুটা সুস্থ হলে মাকে হাসপাতালের গাড়িতে করে বাসায় শিফট করে এমনভাবে যাতে কিছু বুঝতে না পারেন। কিন্তু একটার পর একটা ঝামেলা তৈরি হয়, যদিও এলেক্স সেগুলো ভালোভাবেই ম্যানেজ করে।

মা টিভি দেখতে চাইলে এলেক্স এক কাজ করে, তার এক ক্রিয়েটিভ বন্ধুর সাথে মিলে কিছু ফেইক নিউজ ভিডিও তৈরি করে, যেনো তাঁর মায়ের কাছে মনে হয় এখনো জার্মান ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক আগের মতোই আছে।

এটা করতে গিয়ে এলেক্স হঠাৎ টের পায়, সমাজতন্ত্রের ব্যাপারে ভিন্ন একটা ভাবনা সবসময়ই তার মাথায় ছিলো, যা মায়ের জন্য নতুন করে এইসব ভিডিও বানাতে গিয়ে প্রকাশ পাচ্ছে। সে তার চিন্তায় পূর্ব জার্মানিকে রিক্রিয়েট করে। সে বুঝতে পারে, সে নিজেও এইসব ফেইক নিউজে বিশ্বাস করছে, মনে হচ্ছে এসব ঘটনা ঘটলেই ভালো হত।

এর মধ্যেই পরিবর্তনের ব্যাপারে ভাইবোনের মোহভঙ্গ হয়। পশ্চিম জার্মানরা তাদের অত্যন্ত তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, এটা তাদের ইগোতে লাগে, সহ্য হয় না। পুঁজিবাদ নতুন সম্ভাবনার সাথে নতুন সমস্যাও এনেছে। এসেছে মাদক ব্যবসা। বেকারত্ব গেছে বেড়ে। বৃদ্ধি পেয়েছে সন্ত্রাস। তাদের প্রাথমিক মুগ্ধতা পরিণত হয়েছে অপরিসীম বিরক্তিতে।

এলেক্স আর আরইয়ানা জীবনের সবচে বড়ো ধাক্কাটা খায়, যখন তাঁরা জানতে পারে, তাদের মা আসলে মতাদর্শিক কারণে তাদের বাবার সাথে সেপারেশনে যান নি। ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের কারণে দুজনের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছিলো। বাবা তাদের কাছে অসংখ্য চিঠি লিখেছিলেন, মা এসব লুকিয়ে রেখেছিলেন, পড়তে দেন নি। মৃত্যুর প্রাক্কালে ক্রিশ্চিয়ানা সন্তানদের কাছে ক্ষমা চান। এলেক্স পশ্চিম জার্মানিতে যায় বাবার সাথে দ্যাখা করতে, সেখানে গিয়ে দেখে তার বাবা আরেকটা বিয়ে করেছেন, অই ঘরেও তাঁর ছোটো ছোটো ছেলেমেয়ে আছে। আরইয়ানা মায়ের কাছ থেকে শুনে বাসায় গিয়ে যেখানে চিঠিগুলো এতোদিন লুকিয়ে রাখা হয়েছিলো সেখান থেকে উদ্ধার করে, পড়তে পড়তে তার বুক ভেঙে যায়, সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে।



ইরফানুর রহমান রাফিন