"/> অন্তর্জাল
জেন্ডার
সকল ক্ষেত্রেই নারীদের মধ্যে এক ধরণের বৈরিতা জারি আছে
উম্মে রায়হানা -11/11/2016





ফেসবুকে অবিবাহিত পুরুষ বন্ধুদের হাহাকার দেখতে পাই প্রায়ই। তারা ব্যাচেলর বইলা বাসা ভাড়া পায় না ইত্যাদি। কথা সইত্য, খালি বাসা ভাড়া না, তাদের রান্না করতে বুয়া রাখা লাগে, কাপড় কাঁচতে লন্ড্রির বিল দিতে লাগে, এমন অনেক খরচ তাদের আছে যেটা বিবাহিত পুরুষদের নাই। একই অফিসের অবিবাহিত ছেলেটা যখন হোটেলের খাওয়া খায়া আলসার বান্ধায় ফেলে, তার বিবাহিত কলিগটা তখন হটপটে কইরা বৌ এর রান্ধা খাওন নিয়া ক্যান্টিনে যায়। তার খরচও কম হয় আর স্বাস্থ্যও ভালো থাকে।

ভারতীয় এক অর্থনীতিবিদ এই জিনিসটারে এভাবে দেখাইছিলেন যে, এই যে পরিবারে নারীর বিনামূল্যে শ্রম এতে খালি একটা পুরুষের উপকার হইতেছে এমন না। বরং প্রতিষ্ঠান ও সরকারেরও উপকার হইতেছে।

ক্যামনে? যে লোকরে ৩০ হাজার টাকা বেতন দিলে চলে, সে যদি ব্যাচেলর হয় তার বাসা ভাড়া খাওয়া খরচ অফিসের কাপড় পরিষ্কার রাখার লন্ড্রির বিল সব দিয়া কিছুই থাকব না, তারে দিতে হইব ৩৫ থিকা ৪০ হাজার টাকা। কিন্তু সে বিবাহিত হইলে তার নানা রকম খরচ কইমা যাবে আর সে ৩০ হাজার টাকাতেই চালাইতে পারবে। তার উপরে বৌ যদি চাকরি করে, আজকাল সব বৌই করে প্রায়, তাইলে তো কথাই নাই। ফলে শ্রম বাজারের উপরে ডেফিনিটলি এর প্রভাব আছে।

কিন্তু সমাজে প্রচলিত আছে অন্য কথা, বৌ পালতে হয়, বৌ মানে খরচ ইত্যাদি।

সে যাই হোক সেদিন একটা টার্ম শিখলাম, মক্ষীরানী কমপ্লেক্স। রোকেয়া প্রাচী আর প্রসূন আজাদের দ্বন্দ্ব আর প্রসূনকে নিষিদ্ধ করার প্রসঙ্গে অ্যানি আপা বলতেছিলেন কথাটা। সিস্টারহুড তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রে এটা একটা বাঁধা।

সিস্টারহুড বিষয়টা নারীপ্রশ্নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, সমাজের সকল ক্ষেত্রেই নারীদের মধ্যে এক ধরণের বৈরিতা জারি আছে, এটা তৈরি কইরা রাখা আছে। কেননা তারা যদি সংগঠিত হয় এবং ব্যাটাগিরির সমাজ তাদের উপরে যে যে বৈষম্য আর শোষণ চাপায় দিয়া রাখছে সে সব আইডেনটিফাই কইরা ফালায় তাইলে সমাজের অনেক কিছুই ভাইঙ্গা পড়বে।

প্রথমে যে উদাহরণটা দিলাম সেইটাই যদি ধরি, অনেক দেশে গৃহশ্রমের জন্য বেতনের দাবি উঠছে। সেটা সম্ভব কি সম্ভব না পরের প্রসঙ্গ। কিন্তু হিসাব করলে দেখা যাইব বুয়া, লন্ড্রি, বাচ্চাদের ইস্কুলে আনা নেওয়া, হোমওয়ার্ক করানো, বুড়া বাপমায়ের যত্ন- সব কিছুর জন্যে যদি বাড়ির কর্তার আলদা আলদা লোক রাখতে হইত তাইলে তার খরচ দেড়গুণ হইত।

এখন সব বৌ মিলা এই দাবি তুললে মুশকিল না?

কাজেই মহিলাদের মধ্যে বৈরিতা তৈরি কইরা ‘মেয়েরাই মেয়েদের শত্রু’ জাতীয় বস্তাপচা প্রবচন জারি রাখা সমাজের নিজের স্বার্থেই খুব জরুরি।

সিস্টারহুড নিয়া ভাবতে ভাবতেই সেদিন মেয়েরাই মেয়েদের শত্রু ধরণের ফেইক কথা অ্যাপারেন্টলি সত্যি মনে হবে এমন একটা ঘটনার মধ্যে দিয়া গেলাম।

গেছিলাম পাসপোর্ট অফিসে। অনলাইনে ফর্ম ফিলাপ করা। কোন ঝামেলাই হওয়ার কথা না। গেইটে ঢুইকাই দেখি মাঝারি একটা লাইন। আমি কইলাম – মেয়েদের লাইন কই? এক আর্মি আইসা কইল- এইটাই লাইন।

কাউনটারে পৌঁছায় দেখলাম আমার সব ঠিক আছে কিন্তু আগের পাসপোর্টের ফটোকপি লাগবে, সেটা আমি নিয়া যাইনাই। লাগতে পারে ভাইবা আস্তা পাসপোর্টই নিয়া গেছিলাম। গেলাম ফটোকপি করতে। ফিরা দেখি লাইনের কুনো অস্তিত্ব নাই। কতগুলা ব্যাটা ধাক্কাধাক্কি কইরা নিজের নিজের ফর্ম জমা দিতেছে আর কতগুলা মহিলা কোনঠাসা হয়া খাড়ায়া আছে। আমি চিল্লাচিল্লি শুরু করলাম। সেই আর্মি ব্যাটা আইসা কয়- আপনি মেয়েদের লাইনে যান।

আমি কইলাম – আমি তো শুরু থিকাই মেয়েদের লাইন খুঁজতেছিলাম। আপনেরা তো মেয়েদের জন্যে কুনো লাইন বানান নাই। এখন ধক্কাধাক্কি দেইখা মেয়েদের একপাশ করছেন।

রীতিমতো ঝগড়া। আমার হাউখাউ দেইখা নারীদের মুখে সন্তুষ্টির হাসি ফুইটা উঠতেও দেখলাম। কিন্তু কেউ একটা লবজও বলেন নাই।

যাই হোক, দারুণ অব্যাবস্থার মধ্যে দিয়া গেলাম পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা, ৪০ মিনিট লাইনে খাড়ায়া ফর্ম দেওয়ার পর মামায় কয়- আপনে এখানে ক্যান? আপনের তো অনলাইনে সব করা, অমুক তলার তমুক নম্বর টেবিলে যান।

ফাইনালি যখন জমা দেওয়ার রুমে পৌঁছাইলাম সেখানে দেখি আরেক সিস্টেম। মেয়েদের জন্য আলদা কিউ আছে, কিন্তু পুরুষের কিউ থিকা চাইরজন নিলে মেয়েদের থিকা নেয় একজন। লাইনের শুরুতে যারা থাকেন তারা মিন মিন কইরা সামান্য আপত্তি জানান হয়তো, কিন্তু তাতে খুব লাভ হয় না। যে বুড়া চাচা আমার পড়ে আইসা সিঁড়ির কাছে দাঁড়াইয়া ছিলেন, তারে দেখলাম ঢুইকা গেলেন, আমি আমার লাইনের অর্ধেকেও যাইতে পারি নাই- এমন অবস্থা।

আমি খানিকক্ষণ আশেপাশের মহিলাদের লগে এই নিয়া আলাপ করলাম তারপর আরেক আর্মি ব্যাটারে পায়া কইলাম- এই অবস্থা, আমি এক বর্ণ মিথ্যা বলতেছিনা, উনাদের জিগান। আমি আগে যাইতে চাই এমন না, আমি আমার জাগায় গিয়া দাঁড়াইলাম, আপনে বিষয়টা দেখেন।

এরপর পরিস্থিতির একটু উন্নতি হইল। আর্মি ভাই দারোয়ানরে কইলেন- মহিলা বাইরাইলে মহিলা ঢুকবে, পুরুষ বাইরাইলে পুরুষ ঢুকবে।

একসময় আমার টাইম আইলো, তার আগেই দেখছিলাম এক মহিলা ইউ হয়া বেইকা যাওয়া লাইন থিকা আমার একজন আগে আইসা দাঁড়াইছেন, কোলে বছর তিনেকের একটা বাচ্চা আর বয়স্ক মা অথবা শাশুড়ি। উনি ঐ আর্মি ব্যাটারে কী কী জানি কইতেওছিলেন। আমার আগের জন চামে ঢুইকা গেলেন, কিন্তু আমি সেটা না কইরা ঐ মহিলারেই যাইতে দিলাম।

আমার পেছনের এক মহিলা মহা ক্ষেইপা কইলেন- এটা উনি কী করলেন? আমরা সবাই অনেক্ষন অপেক্ষা করতেছি। আপনি কিছু বললেন না ক্যান?
আমি বললাম- উনার কোলে একটা ছোট বাচ্চা আছে, উনার জন্য দাঁড়ায় থাকা আমাদের চে ডাবল কষ্ট। কী বলবো?

উনি থামলেন না। ঐ সুন্দর দেখতে আর্মি ব্যাটা আবার ঘুরান দিয়া আসলেন আর উনি চিল্লাপাল্লা লাগায় দিলেন। আমাদেরও বাচ্চা আছে, কোলের বাচ্চাম ড্রাইভারের কাছে রাইখা আসছি,নিয়া আসব? ইত্যাদি। আরও দুয়েকজনও দেখলাম সমর্থন দিতেছেন।

আমি চুপ। খালি শুনতেছি। শুনতে শুনতেই আমার টার্ন আসলো। ঢুইকা বুঝলাম কী বইলা ঐ বিক্ষুব্ধ মহিলাকে চুপ করানো গেছে। এই বাচ্চার মা বাচ্চার দোহাই দিয়া আগে ঢুইকা গেছেন বিষয়টা মোটেই এরকম না। বাচ্চাটারি পাসপোর্ট করা হইতেছে এবং তারে ক্যামেরার সামনে স্থির রাখতে মা নানী/দাদী এবং ক্যামেরাম্যানের জান খারাপ হইতেছে। মহা গুটলু সে। একটা কথা জানে, সমস্যা নাই। কেউ যদি কইল- এটা ধইরো না, ব্যাথা পাবা। সে বলে- সমস্যা নাই।

যাই হোক, যেটা বলতেছিলাম, সিস্টারহুড। আমার মতন অধৈর্য আর অস্থির মানুষ যে বিবেচনা দেখাইতে পারলাম এই মডেস্ট, সোবার মহিলারা সেইটা



উম্মে রায়হানা
লেখক: অন্তর্জাল.কম