"/> অন্তর্জাল

দুজন মাত্র মানুষকে তাদের ভূমিকার জন্য নায়ক হিসেবে শ্রদ্ধা জানাতে হবে
-11/11/2016





১০ নভেম্বর একজন গূরুত্বপূর্ণ মানুষের মৃত্যুবার্ষিকী, খানিকটা অগোচরেই পালিত হয় প্রতিবছর। ভবিষ্যতে যদি কোনদিন বাংলাদেশের ৭২ সালের সংবিধান,তার অন্তর্গত স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামো নিয়ে আলাপের পথ খুলে যায়, দুজন মাত্র মানুষকে তাদের ভূমিকার জন্য নায়ক হিসেবে শ্রদ্ধা জানাতে হবে। এদের একজন এম এন লারমা। অন্যজন, অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত।


এই লেখাটা এম এন লারমা বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন উপলক্ষে যে বক্তৃতাগুলো গণপরিষদে দিয়েছিলেন, তারই একটা সংকলন।


খুবই সরল এবং অনাড়ম্বর ভঙ্গিতে কথা বলতেন লারমা, গণপরিষদের সভায় তার বক্তৃতাগুলো পড়লে যে কেউ সেটা অনুভব করবেন। জানি না পাহাড় তাকে এই সারল্য উপহার দিয়েছিল কি না। কিন্তু খুব ঋজু ভাষায় এই সরল মানুষটা গণপরিষদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন ৭২ সালের সংবিধানের ক্ষমতাকাঠামো হুবহু আইয়ুব খানের সংবিধানের অনুসরণ। এই দুই সংবিধানের পার্থক্য কেবল অলঙ্কারের, সারবস্তুর দিক দিয়ে তা এক, সেটা সংবিধান বিষয়ে এই দুই জনের আলোচনা পড়লেই বোঝা যাবে।

তাড়াহুড়ো করে সংবিধান প্রণয়ন করার বিরোধিতা করেছিলেন তারা। গণমত যাচাই না করার বিরোধিতাও করেছিলেন তারা। বিরোধিতা করেছিলেন ভবিষ্যতের সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার বন্ধ করে দেয়া ৭০ অনুচ্ছেদের। বিরোধিতা করেছিলেন ৩২ অনুচ্ছেদে ব্যক্তিস্বধীনতাকে আইনের মারপ্যাচে আদালতের বদলে পুলিশের হাতে তুলে দেয়ার বন্দোবস্তের। ৩৯অনুচ্ছেদের দ্বিতীয় দফায় নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, শালীনতা বা নৈতিকতার নামে চিন্তার স্বাধীনতা রুদ্ধ করার খোলামেলা ঘোষণার বিরোধিতা করেছিলেন। বলেছিলেন, আইয়ুব খানও তার সংবিধানে এই সব অধিকার দিয়ে একই কায়দায় তা কেড়ে নিয়েছিল। সেদিন যে আওয়ামী লীগ সেগুলোর বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল, আজকে তারা সেই আইয়ুবী অনুচ্ছেদগুলোই চাপিয়ে দিচ্ছে।


গণপরিষদে তাকে আসলে ততটা কথা বলতে দেয়া হয়নি। বারংবার তাকে থামিয়ে দেয়া হয়েছে, সেটা স্পিকার যেমন করেছেন, তেমনি করেছে আওয়ামী সদস্যরা হৈচৈ করে। আমাদের সংবিধান প্রণয়ন নিয়ে যতটুকু বিতর্ক হয়েছে, তার আধখানা আসলে্ এই ভদ্রলোক একাই করেছেন।


কিন্তু আওয়ামী লিগের সংসদ সদস্যরা কেন চুপ করে ছিল? কেন তারা এই সব ভয়ঙ্কর বিধি সংবিধানে যুক্ত করার বিষয়ে কোন কথা বলেনি? তারা কি সকলে এত খারাপ মানুষ ছিল?


না, তারা সকলে খারাপ যে ছিলেন না; সেটা কর্তারাও জানতেন। তাই বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের আগেই রাষ্ট্রপতির আদেশ জারি করে সংবিধান প্রণেতারা যেন কোন স্বাধীন মত প্রকাশ করতে না পারেন, তার বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। সেই অর্থে বাংলাদেশের সংবিধান সম্ভবত সেই বিরল সংবিধানগুলোর একটা, যেখানে সংবিধানের স্বয়ং যারা নির্মাতা, তাদেরও স্বাধীন মত প্রকাশের কোন অধিকার ছিল না।


এম এন লারমার সেই বিখ্যাত বক্তৃতারও উদ্ধৃতি আছে, যেখানে তিনি জোর গলায় বলেছিলেন, তিনি বাঙালি না। তাকে থামিয়ে দিয়ে কতগুলো বাখোয়াজি করেছিল আওয়ামী নেতৃবৃন্দ, চিরস্থায়ী লজ্জার স্মৃতি হয়ে থাকবে তা বাঙালি জাতির জন্য। কিন্তু এম এন লারমাকে স্মরণ করি, কেননা তিনি শুধু পাহাড়ি মানুষের নেতৃত্ব দিতে চাননি, তাদের জীবন, তাদের দারিদ্র, তাদের ভবিষ্যতের কথাই শুধু তিনি ভাবেননি। সত্যিকারের একজন মহান নেতার মত তিনি ভেবেছেন গোটা দেশের সকল মানুষের গণতন্ত্র, তাদের সমৃদ্ধি, তাদের গণতন্ত্র, তাদের জীবন নিয়ে। তাদের আইনী অধিকার নিয়ে।


 

বাঙালি জাতির জন্য এই এক আজন্ম শিক্ষা হয়ে থাকুক, তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য স্বাধীন বাংলাদেশের গণপরিষদে লড়েছিলেন একজন অবাঙালি। বাঙালি-মুসলমানের জন্য শিক্ষা হয়ে থাকুক, তাদের কেউ সেদিন মুখ খোলার সাহস করেননি। এই সমাজ যাদের সর্বদা 'অপর' করে রাখে নিপীড়ন আর দখলের রাজত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে, কেবল তেমন পরিচয়ের দুই জন মানুষই এই প্রশ্নগুলো তুলেছিলেন, মানে তারা নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থের পরিচয়ে আটক ছিলেন না। এই সব পরিচয়ের সীমাবদ্ধতা যেন আমরা অনুভব করি, সেই জন্যই হয়তো ইতিহাস এত বিচিত্র গতিতে অগ্রসর হয়।



ফিরোজ আহমেদ