"/> অন্তর্জাল
মওলা, লালন, গাঁজা, ফোক সং, আখড়াবাড়ি
মওলা পাগলের পঞ্চম স্মরণোৎসব
ফরহাদ মজহার -04/20/2017





লালনকে ‘ফোক সং’ বানানো নতুন কিছু না। বাংলায় ভাবচর্চা বা দর্শন চর্চার ধারা এখন নাই বললেই চলে, ফলে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত যা বুঝতে পারে না তাকে ‘ফোক’ বলেই চালায়। আহাম্মকের দল!!
 

জ বৈশাখের ৫ তারিখ। মওলা পাগলের ভক্তরা তার পঞ্চম স্মরণোৎসব পালন করছে। তাদের অনুষ্ঠান সফল হোক।

সময় কতো দ্রুত চলে যায়! নতুন কিছু কি? এবার নবপ্রাণ আখড়াবাড়িতে দেখলাম দুটো গাছে আম ধরেছে। বালুতে যখন আম গাছ লাগাচ্ছিলাম, পাগলা মওলা সারাদিন আমাকে বিরক্ত করেছে, একবার সে আমগাছের চারা তুলে ফেলে দিল। তার যুক্তি বালুতে আমগাছ হবে না। আমি সারাদিনই তর্ক করলাম যেখানে সাঁইজী কালিগঙ্গা নদি থেকে উঠে এসেছেলেন, ঘাটের ঠিক সেখানেই, যদি খোসকা ডুমুর গাছ হতে পারে, তাহলে আম গাছও হবে। গোপালভোগ, ক্ষীরসাপাতি, রানিপসন্দ -- যদি লাগাই তো হবে। এক সময় বিরক্ত হয়ে বললাম, সাঁইজী আমগাছ পছন্দ করতেন, তার নামে লাগালাম। হবেই হবে।

বালুতে আমগাছ হয়েছে। আমগাছ লাগিয়েছিলাম কারন লালন ফকিরের ধামে ফকির লালন শাহের নিজের হাতে লাগানো আমগাছ কেটে ফেলতে দেখে কয়েকদিন কেঁদেছিলাম। এগুলো স্রেফ পার্সোনাল ইমোশান হয় তো! কী মূল্য!! আমগাছের জায়গায় লালন একাডেমি লাগিয়েছে বিদেশী ঝাউ গাছ। চৌচালা তাঁর আবাস ও আখড়ার জায়গায় গড়ে উঠেছেছে নিজামুদ্দিনের দর্গার চিশতিয়া স্থাপত্য।

বুয়েটের কিছু তরুন স্থাপত্যবিদদের একবার দেখলাম লালনের ধামে গাঁজা খাচ্ছে, এরা লালনের 'ফোক সং' ভাল বাসে। বললাম এই সব গাঁজাসিদ্ধি থুয়ে আসো না আমরা একটা নকশা করি যা নদিয়ার ভাবের সঙ্গে যুক্ত, নবপ্রাণ আখড়াবাড়ি না হয় সেভাবেই বানাবো। এরপর অনেককেই বলেছি। মধ্যবিত্ত শ্রেণি 'ফোক সং' শোনে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই করে না। তরুন স্থাপত্যবিদ খুঁজছি যারা আমাকে একটা নকশা দেবে। আখড়াবাড়ি পাগলদের জায়গা। বিস্ময়কর যে পাগলা মওলা যতো পাগলদের নিয়ে আখড়াবাড়িতে তার ডুমুর গাছের তলে বসিয়েছে তারা কস্মিনকালেও ধোঁয়া হাতে, কিম্বা নেশাগ্রস্ত হয়ে ঢোকে নি। এই নিয়ম মওলা বক্স পাগলদের জন্য করে দিয়েছে।

গাঁজা সিদ্ধি খাওয়া ক্রিমিনাল কিছু না, নদিয়া একে ‘পাপ’ গণ্য করে না। কিন্তু এর সঙ্গে ভাবের কোন সম্পর্ক নাই। লালনের সাধনায় এর কোন ভূমিকা নাই। এদ্দুরই। আমরা কঠোর, কারন লালন গাঁজাখোর ও মেয়েমানুষ নিয়ে গুহ্যবিদ্যার কারবারি – এই বাজে অনুমানের বিরুদ্ধে লড়াই করা শুধু ভাবগত কারনে নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক কারনে জরুরি।

লালনকে ‘ফোক সং’ বানানো নতুন কিছু না। বাংলায় ভাবচর্চা বা দর্শন চর্চার ধারা এখন নাই বললেই চলে, ফলে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত যা বুঝতে পারে না তাকে ‘ফোক’ বলেই চালায়। আহাম্মকের দল!!

পাগলা মওলা নদিয়ার পাঁচ ঘরের অন্যতম একটি ঘর দেলবার শাহের ঘরের সাধক। দেলবার শাহের শিষ্য বেহাল শাহ। এই ঘরের খুবই গুরুত্বপূর্ণ মানুষ ছিল মওলা বক্স। তার ওফাতের পর ছেঁউড়িয়ায় একটা পর্বের অবসান হোল।

নবপ্রাণ আখড়াবাড়ি যতোদিন টিকে থাকবে, প্রতিটি ধূলি ও গাছপালা – বিশেষত ডুমুর গাছ, মওলার স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকবে।
 



ফরহাদ মজহার
কবি, লেখক, দার্শনিক