"/> অন্তর্জাল
পানীয়
বিয়ে বাড়িতে চু
-11/11/2016






যেকোনো ধরনের আতপ চালের সাহায্যে চু তৈরি করা যায় তবে বিন্নি ধানের চাল হতে উৎকৃষ্ট চু পাওয়া যায়। চু সাধারণত প্রবীণ গারো মহিলারা বানিয়ে থাকে। চু এর প্রস্তুত প্রণালী বেশ জটিল। কেননা এর স্বাদ নির্ভর করে 'চুমান্থি'র উপর। গারো ভাষায় চুমান্থি হলো চু তৈরিতে ব্যবহৃত বীজ বা খামি। আতপ চাল ভিজিয়ে সেই চালের সঙ্গে নানা উদ্ভিজ লতাপাতা মিশিয়ে উক্ত চাল ঢেঁকিতে ভালভাবে গুঁড়া করে ময়দার মত কাই করে পিঠা প্রস্তুত করার পূর্বে রোদে শুকিয়ে নিতে হয়। খামি হিসেবে ব্যবহারের জন্য কোনো পিঠাই সরাসরি সরাসরি রোদে না শুকিয়ে পরিষ্কার শুষ্ক খরের উপর সাজিয়ে তার উপর আরেক প্রস্থ শুকনো খড় বিছাইয়া সেই খড় সহ পিঠাগুলিকে ভালভাবে শুকানো হয়। এই খামি মাসখানেক পর চু প্রস্তুতে খামি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। খামি তৈরিতে যেসব লতাপাতা উদ্ভিজ গুল্ম ব্যবহার করা হয়ে থাকে গারো মহিলারা সাধারণত তা গোপন রাখেন এবং সবাই নিজ নিজ অভিজ্ঞতার আলোকে নানান লতাপাতা মিশিয়ে থাকেন। খামির গুনগত মানের উপর চু'র স্বাদ বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। তবে চু সাধারনত মিষ্টি, টক, তিক্ত বা কষা স্বাদের হয়ে থাকে।
চু এর জন্য আঁকড়া আতপ চালই ভাল। আতপ চালের ভাত শুকনা ঝরঝরে রান্না করে অন্ধকার ঘরে পরিষ্কার মাদুরের উপর ছড়িয়ে ভালভাবে ঠান্ডা করে নিতে হয়। ভাত ঠান্ডা হওয়ার পর তাতে পরিমাণমত খামি গুঁড়া করে মিশাতে হয়। পরে একটি পরিষ্কার বড় মাটির ভান্ড যা কমপক্ষে সপ্তাহ খানেক আগুনের আচে সেঁক দিয়ে শুকনা করে তোলা হয়েছে সেই ভান্ডে মাঝখানে বাঁশের বুনানো দেড় হতে দুই ফিট উচু এবং ঐ মাপের গোলাকৃতি তলাবিহীন ঝুড়ি গারো ভাষায় যাকে 'ঝানছি' বলা হয় সেই ঝানছি বসিয়ে ঝানছির চারপাশে খামি মাখানো ভাত সাজিয়ে উপরিভাগে কয়েক স্তর আগুনে সেঁকা কলাপাতার আবরণ দিয়ে ভান্ডের মুখ ভালভাবে আঁটকে অন্ধকার ঘরে রেখে দিতে হবে। এইভাবে দুই তিন সপ্তাহ রাখার পর ভাত ভালভাবে পচে ঝানছির মাঝখানে রস জমা হয়। এই নির্ভেজাল রসকে গারো ভাষায় বলায় 'চু-বিচ্ছি'। অনেকের মতে এই চু-বিচ্ছি বিদেশি যে কোনো উন্নতমানের বিয়ারের তুলনায় উৎকৃষ্ট এবং সুস্বাদু অথচ এতে অ্যালকোহলের পরিমাণ খুবই কম।
চু-বিচ্ছি তুলে নেয়ার পর ঝানছির চারপাশে ভাতের উপর ঠান্ডা জল ঢালা হয়। ঐ সময় ঝানছির মাঝখানে পুনরায় যে রস জমা হয় তা তুলে বার বার ভাতের উপর ঢালা হয় এতে করে ঝানছির মাঝখানের রস ক্রমশ গোলা হতে থাকে। সেই ঘোলাটে রস আসরে উপবিষ্ঠ প্রবীণ ব্যক্তিকে এবং অতিথিবৃন্দকে পরিবেশন করা হয়। চু গারোদের প্রধাণ পানীয় দ্রব্য হিসেবে, সামাজিক শিষ্টাচার ও কৃষ্টির অঙ্গ হিসেবে এবং শারীরিক পরিশ্রমের পর ক্লান্তি দূর করার জন্য পান করা হয়। যদি পরিমানে অল্প এবং নিয়মিত পান করা যায় তবে এই চু শরীরের পক্ষে বেশ উপকারি। মূত্রাশয় পরিষ্কার, ক্লান্তি দূর এবং মাংশপেশি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
তবে বাণিজ্যের লক্ষ্যে সম্প্রতিকালে গারো সমাজে চোলাই মদের ব্যবহার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই চোলাই মদের কোনো সামাজিক স্বীকৃতি নেই। এতে অ্যালকোহলের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত এবং স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। চোলাই মদে নেশা তীব্র হওয়ার জন্য বিষাক্ত লতাগুল্ম ছাড়াও কোনো ক্ষেত্রে ধুতুরা ফুলের রস মিশানো হয়। সম্প্রতি চোলাই মদ গারো 
সমাজে এক বিশেষ ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। চু যেমন আবহমানকাল হতে যুগ যুগ ধরে ঐতিহ্যবাহী গারো কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে লালন করে আসছে এবং সামাজিক মূল্যবোধ ও জীবনবোধের চেতনাকে সঞ্জিবীত করে রেখেছে ঠিক বিপরীত দিকে চোলাই মদ গারো কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে এবং সামাজিক মূল্যবোধকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।