"/> অন্তর্জাল
ধর্ম, কমিউনিটি, মুসলিম, হিন্দু
ইস্যু রিভিউঃ সনু নিগমের আজান শুনতে না চাওয়া
সাদ রহমান -04/26/2017





একই সঙ্গে মুয়াজ্জিনের আজান এবং সনু নিগমের গান যদি বাজতে না পারে কমিউনিটিতে, তাহলে আমি ওই আজানকে হইতে দিবার পক্ষে যেই কমিউনিটি প্রাকটিসের কথা বলছিলাম, তার কোন গুরুত্ব তো দাঁড়ায় না।


সিঙ্গার সনু নিগমের আজান শুইনা কষ্ট পাওয়ারে, আঘাত পাওয়ারে, তার ঘুমের বেঘাত ঘটারে নিয়া সর্বশেষের কিছু কথা বইলা ফেলতে চই। তাই, এই লেখাখানি লেখতে বসলাম। এইসব তৈরিত ইস্যুর ভিতর দিয়া আমরা দেখতে পারছি, পুরান পুরান পক্ষ ছাড়া নতুন কোন পক্ষ এই দুনিয়ায় আর দাঁড়ায় না। ফলে ইস্যুতে ইস্যুতে যে যে পক্ষ দাঁড়ায়, সে সে পক্ষকে সুন্দর আর ভালো বানানো ছাড়া উপায়ও নাই। ফলে আমি যেইটা করতে পারি, এইসব ইস্যুর শেষদিকে আইসা, এইসব মতের বিরোধ আর তার যুদ্ধের সর্বশেষ হিসাবখানি তুইলা ধরতে পারি। যেই হিসাব দুই পক্ষেরই নিজ নিজ চিন্তার গোজামিল আর অধিকারকে নোটিশ করতে পারে। সে অর্থে এই লেখাটি ‘সনু নিগমের আজান শুনতে না চাওয়া’ প্রসঙ্গের একটি রিভিউ হয়।

এই পর্যন্ত সনু নিগমের আজান শোনার কষ্ট নিয়া ফেসবুকে আমি বিভিন্ন লেখা পড়ছি, সামনে আসছিলো বইলা। এর বাইরে একটু আগে খুঁইজাও দেখছি কে কি বলতে চাইছেন। অল্প কিছু লেখাপত্র পাইছি। খেয়াল করলাম, আমি যা লেখমু তা কেউ লেখেন নাই। সকলেই মতের এই-পক্ষ আর ওই-পক্ষকে জাস্টিফাই করছেন। অনেকরকম বলছেন। মোটের উপর দুইটি জায়গাই এখনো পর্যন্ত রইছে। একদল শুনতে চান না আজান, আরেকদলের শুনতে অসুবিধা নাই। অসুবিধা নাই বলতে আপত্তি করবার জায়গা নাই তাদের, এমন তারা স্বীকার করছেন। ফলে উনাদের কাছে সনু নিগমের এই মাইকে আজান বন্ধ করবার আর্গুমেন্টখানি বেশ বেহুদাই মনে হইছে।

আমারও আজান শুনতে আপত্তি নাই, কিন্তু আমি সনু নিগমের আর্গুমেন্টটিকে নিপাট বেহুদা বইলা দিতেও রাজি নাই।

অপরদিকে অনেকে তাদের নিজস্ব সেকুলারি অধিকারের ভিতর দিয়া বলতে চাইছেন, উনারা প্রতিদিন পাঁচবার কইরা মসজিদের মাইকের আজান শুনতে রাজি নন। আমি ভদ্রলোক হিসাবে বুঝতে পারছি এই রাজি না থাকার কারণ। যেহেতু উনি আজানের ভোক্তা নিজেরে ভাবেন না, আজান শুইনা উনি নামাজে যান না, অথচ এই নামাজে যাইবার এলার্ম তাকে শুনতেই হয়। অবশ্যই অবস্থা বেশ করুণ হয় এতে। কিন্তু আমগোর এই মুসলমান-হিন্দু আর সেকুলার দিয়া গঠিত তৃতীয় বিশ্বে, আমরা যেই কমিউনিটি প্রাকটিসরে স্বীকার কইরা নিছি, তার কারণেই মুসলমানের এলার্ম শোনাও আমাদের স্বীকার কইরা নিতে হয়। যতোদিন পর্যন্ত না উনারা স্বীয় চিন্তা দ্বারা আজানরে মাইক করা বন্ধ করবেন, ততোদিন আমাদেরও তা শুইনা, কানে আঘাত পাইয়া, ঘুমের বেঘাত মাইনা যাওয়ার প্রাকিটসও জারি রাখতে হবে।

কমিউনিটি প্রাকটিসের এই দশা নিয়া ভাবনা করা যায়। মুসলমানের স্বীয় চিন্তাতে অধিকার বিষয়ে, অন্য নাগরিকের কষ্ট ও আরাম বিষয়ে সচেতনতা ঢোকানোর কথা ভাবা যায়। এবং সেটা অবশ্যই নিজের অধিকারের পক্ষে কোন গোজামিল না দিয়া। সেই হিসাবে উনারা যতক্ষণ উনাদের অধিকারের ভিতরে থাইকা, এই মাইকে আজান দেওয়ারে যৌক্তিক ভাইবা কমিউনিটিতে বসবাস করবেন, তা আমাদের মাইনা নিতে হবে।

মাইকে আজান দেওয়া নিয়া আমরা কি করতে পারি, এইটুকু হিসাবের পরে এইরকম একটা পরিস্কার অবস্থা দেখা যায়। এবং এখন পর্যন্ত এইটুকুই দেখা যাইতেছে। ফলে আজান বিষয়ে কমিউনিটির হিসাব নিকাশ কমিউনিটি প্রাকটিসের অংশ হইতে পারে, একথা বলা যাইতেছে। কিন্তু সিঙ্গার সনু নিগমের হিসাব নিকাশ বাকি রয়।

এই ইস্যু তৈরি হবার প্রথম দিনেই আমার মাথায় প্রশ্ন আসছে, হোয়াই সনু নিগম? হোয়াই সিঙ্গার সনু নিগম দিনমান হরেক ইন্সট্রুমেন্টের হরেক শব্দ শুইনা ও বাজাইয়া, রাইতবিরেতে সঙ্গিত আর বাদ্যযন্ত্র কইরা, মসজিদের মাইকে আজান দেওয়ারে কানের আঘাত হিসাবে নিলেন। মসজিদ হইতে আসা এক সুরেলা কণ্ঠরে মাইনা নিবার উপযোগী কর্ণ উনার থাকবার কথা। তবে নাও থাকতে পারে, সিঙ্গার হইছেন বইলা উনার সুরেলা আজান শুনবার কান থাকতে হবে, এই মার্কা শর্ত আমি দিবো না। তবে একজন সিঙ্গার যখন সহজভাবে এমন আর্গুমেন্ট দিবেন যে, তিনি আজানের ভোক্তা নন, তখন এই আজানের সুর আর সিঙ্গারের সুরের যেই মহাবিরোধ, তাকে ওভারলুক করা হইবে। এই ইস্যুটি সিঙ্গার সনু নিগমের আর্গুমেন্ট দ্বারা তৈরি হওয়াতে আমি এই মহাবিরোধকে ওভারলুক করতে চাই না। আমি সনু নিগমের কানের আঘাতের বাইরেও তার মনের আঘাতরে ভাইবা দেখতে চাই। এবং ব্যাপারখানি আমার চারিপাশের প্রেক্ষিতেও হাজির করতে চাই।

মসজিদে যেই আজান হয়, সেই আজানের ভোক্তাদের কাছে আজানটি আসলে ক্যামন, তা ভাইবা দেখা লাগে। তাতে পষ্ট হয়, উনাদের কাছে আজান এক পবিত্র ধ্বনি। ধার্মিকের তরে কোন বস্তু বা বিশ্বাস পবিত্র থাকবে, তা নিয়া অন্য কারোরই কথা বলবার দরকার পড়ে না। অধিকার তো নাই-ই। কিন্তু এক পবিত্রতার ধারণা যখন অন্য আরেক চিন্তা বা চর্চারে অপবিত্র কইরা তোলে, এবং সোসাইটির ভিতরে তা জারি থাকে, তখন কথা বলবার দরকার হয়। বলতে চাই যে, একজন মুসলমান তার আজানের পবিত্রতার কাছে, গান কিম্বা সঙ্গিতকে অপবিত্র মনে করেন, তা নিয়া কোন আপত্তি নাই। কিন্তু পবিত্রতা দিয়া অপবিত্র বানানের এই স্ট্রাটেজি যখন সোসাইটিও মেইন্টেন করে, কমিউনিটি মেইন্টেন করে, তখন তাতে ইন্টারপ্রেটেশন করতে হয়।

যতোদূর বুঝি, মুসলমানদের ধর্ম ইসলাম কেবলই অর্থ বা বক্তব্যগত কোন ধর্ম নয়। ইনাদের কাছে সুর, ব্যঞ্জনা, কাব্য, ইত্যাদি ব্যাপারও খুব গুরত্বের ব্যাপার। অর্থ না বুইঝা সুর কইরা যাওয়াকেও উনারা গুরুত্বসহ দেখেন। ফলে এই সুর উনাদের বিনোদন বা নন্দন বা আনন্দের মিডিয়া হইয়া থাকতে পারে, যা মুসলমানদেরকে অন্য সুরের বিনোদন ও নন্দন হইতে ফিরাইয়া রাখার এক হিসাবও বটে। এই ফিরাইয়া রাখার ভিতরে কোন সমস্যা আদতে পাওয়া যায় না। যে যার অনুসারিদেরে নিজের বিনোদনে অভ্যস্ত কইরা তুলবেন, এই-ই স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় আরো পরে, যখন বিধানের ইসলামের সুরই একমাত্র পবিত্র সুর, তা ঘোষণা করা হয়। এবং এরই ভিতর দিয়া অন্যসব ‍সুরকে অববিত্রতা হেতুতে না শুনবার কথা বলা হয়। ইসলামের এই বিধানকে সামহাউ কমিউনিটি গ্রহণ কইরা নিয়া অন্য সুর কিম্বা গানের ভোক্তাদেরকে ঝামেলায় ফেলে দেয়।

ব্যক্তিগতভাবে সনু নিগম এবং এই ওয়ার্ল্ডের তাবৎ সিঙ্গারদের মনে এরকম একটা দুঃখ কিম্বা কষ্ট থাইকা থাকবে। আমি সেইটা নিয়াও ভাবতে চাই। ভাবতে গিয়া দেখি, মসজিদের আজান কানে আসামাত্র যেই ব্যক্তি সনু নিগমের গানটি পজ বা মিউট কইরা দেন, সেই ব্যক্তির ব্যাপারে আমি কথা বলতে পারি না। যদিও সিঙ্গাররা তাতে মনে কষ্ট পাইয়া থাকেন। তবে, আমি ওই ব্যক্তির সঙ্গে বাৎচিতে যাইতে পারি, যেই ব্যক্তি মসজিদের মাইকের আজান কানে আসামাত্র উনার চারিপাশ হইতে সকল সনু নিগমকে মিউট কইরা দিতে বলেন। কারণ এই মিউট কইরা দেওয়াই কমিউনিটিতে আঘাত করে। উনি পবিত্র আর অপবিত্ররে একলগে বাজতে দিবেন না, তা কিভাবে হয়। একই সঙ্গে মুয়াজ্জিনের আজান এবং সনু নিগমের গান যদি বাজতে না পারে কমিউনিটিতে, তাহলে আমি ওই আজানকে হইতে দিবার পক্ষে যেই কমিউনিটি প্রাকটিসের কথা বলছিলাম, তার কোন গুরুত্ব তো দাঁড়ায় না।

আমি বিভিন্ন সময় খেয়াল কইরা দেখছি, আমার মহল্লার যেই বাড়িঅলাটি আজান শুইনা মসজিদে যান, যিনি মহল্লার মুসল্লি বাড়িঅলা হন, উনার কারণে অন্য বাড়িঅলার বিল্ডিংয়ের ছাদে হওয়া গানের কনসার্ট তোপের মুখে পড়ে। ঠিক একইভাবে মহল্লার মোড়ে ডি-জে বাজাইতে থাকা পোলাপান মসজিদ হইতে আসা মুসল্লির সামনে কাঁচুমাচু হইয়া পড়তে বাধ্য হয়। একটি মসজিদের মুুয়াজ্জিন যতোখানি সদর্পে মাইকে আজান দেন, এই থার্ড দুনিয়ার মুসলমানগরিষ্ঠ কমিউনিটিতে একজন সিঙ্গার তেমন সদর্পে মাইকে গান গাইতে পারেন না। উনারে দূরে যাইতে হয়। মাঠে যাইতে হয়। এই মাঠে যাওয়াও যদি কমিউনিটি প্রাকটিসের অংশ হয়, তবে যেই লোক আজানের কারণে ঘুমের বেঘাত মানতে চান না, তাকে ওকে কইরা দেয়া লাগে। ফলে ধর্ম, এবং ধর্মের পবিত্রতার ধারণা দ্বারা কমিউন যখন পিপলের অধিকারকে নির্ধারণ করতে চায়, তখন এই অধিকার মুয়াজ্জিনরে কার্যত সুবিধা দেয়, সিঙ্গারকে দেয় না।

এক স্থানে এক ধর্মের লোকেদের সংখ্যা কম বা বেশি হওয়ার কারণে বলা যাইতেছে না, সনু নিগমের মহল্লায় তিনি দিনেরাতে পাঁচবার জোরে মাইকে গান গাইবার অধিকার রাখেন কিনা। কিন্তু আমি আমার মহল্লায় দেখি, ইন্ডিয়ার সেই সনু নিগমের গানের কোন ভোক্তা যদি চান, দিনেরাতে পাঁচবার একটা কইরা গান মাইকে বাজাইবেন, তিনি পারবেন না। এইখানে কমিউনিটির বিরক্তির কারণ তিনি হইবেন। কেননা, কমিউনিটি নিজেই ধর্মের সেই পবিত্রতা আর অপবিত্রতার বিধানরে নকল কইরা বইসা আছে। না, কমিউনিটি প্রাকটিস ধার্মিকের সুবিধা বিবেচনা কইরা করা যায় না। কমিউনিটির ‍সুবিধা বিবেচনা কইরা করতে হয়। নাইলে শুধু ধার্মিক নয়, সংখ্যাগরিষ্ঠরেও এর ভিতর দিয়া পূজা করা হয়। এটা তো হইতে পারে না।

বাংলাদেশে মাইকের আজানের তুলনায়, দিবস-টিবসে সরকারি দলের লোকদের দ্বারা বাজানো গান ও বাদ্য ছাড়া, আর কেউ তেমনভাবে মাইকে গান বাদ্য করার অধিকার বা ক্ষমতা রাখেন না। আজানের ভোক্তাদের অধিকারের ধাক্কায় গানের পোলাপান চাইলেই পারেন না, গান বাজাইবেন নিজেগোর মতো। অথচ আমরা একই কমিউনিটিতে বাস কইরা আজানের ডিস্টার্বকে যেভাবে এড়াইয়া যাই, সেইভাবে গানের ডিস্টার্বকে এড়াই না, তাকে বন্ধ কইরা দেই। এইভাবে ধর্মীয় বিধানের আঙ্গিকে ছাড় দিলে কেবল ধার্মিকই ছাড় পায়, বাকি গোয়ামারা খায়। সুতরাং এটাই বলবার থাকে যে, মাইকের আওয়াজের কারণে লোকের যে বিরক্তি বা ঘুমের বেঘাত হয়, সেইটারে যেনো ইসলামের আজানের পবিত্রতা দিয়া দেখা না হয়। বরং কমিউনিটিতে একসঙ্গে বসবাস করবার ইচ্ছা দিয়া তাকে দেখতে হইবো।

যাই হোক, আমি যা বলছি তা সনু নিগম এখন পর্যন্ত বলতে পারেন নাই। পারবেনও না বোধহয়, এমনকি সিঙ্গারের মনের দুঃখ উনার নাও থাকতে পারে। তবে উনার আচরণে সেই মনের দুঃখ বেশ টের পাওয়া যায়। আমার মনে হয়, এই মনের দুঃখরে উনি মুখে বললে ভালো হবে। অন্যথায় আজানে ঘুমের বেঘাত হয়, এইটাইপ কথা প্রথমত কমিউনিটিরই বিরুদ্ধে গিয়া দাঁড়াবে। দ্বিতীয়ত ঘুমের বেঘাতের কথা উল্লেখ কইরা উনি ডিভাইসে আজান এলার্ম দিবার যেই সমাধান দিবেন, তা মোটের উপর টেলিকম কোম্পানিগুলাই লুইফা নিবে। সনু নিগমের বুঝতে হবে এই দুনিয়ায় টেলিকম কোম্পানিগুলার কোন মান-অপমানের সওয়াল নাই, তিন টাকা দরে মুসলমানের কাছে আজান বিক্রি করতে তারা খুব রাজি আছেণ। কিন্তু এই থার্ড দুনিয়ার সিঙ্গার হওয়ার কারণে উনার সেই মান-অপমানের সওয়াল আছে, অধিকার পাওয়া না-পাওয়ার সওয়াল আছে। এই সওয়াল সনু নিগম সহ থার্ড দুনিয়ার তাবৎ সিঙ্গারদেরই তুলতে হইবো।

Save



সাদ রহমান
লেখকঃ অন্তর্জাল.কম।