"/> অন্তর্জাল
সাক্ষাৎকার
ভবিষ্যতে বিজ্ঞানের থেকেও উৎকৃষ্ট মিথের সম্ভাবনা আছে: কার্ল স্যাগান
-11/11/2016





 

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন : জোনাথান কট। এছাড়া, টি এস এলিয়টের ‘Little Gidding’  এবং  বব ডিল্যানের ‘Mr Tambourine Man’- এর লাইনগুলোর তর্জমা করেছেন নাফিস সবুর। প্রকাশকাল: ডিসেম্বর ২৫, ১৯৮০।
-শফিউল জয় (অনুবাদক)।


প্রশ্ন : আপনার ‘কসমিক কানেকশন’ বইয়ে আপনি এলিয়ট থেকে উদ্ধৃত করেছেন : "আমাদের অপার প্রভূত পথের দিশা জ্যোতির্ময় পলকে সে থাকে জাগরুক / তার থেকে মামুলি বেচান মানুষ / সকল সমস্ত গহন, অতিক্রমের পর ।  পুরান সম্ভাবনায় রম্ভে চমক বাঁচায়া ফেরা তার- । প্রথম এইবার নিজের পায়ের ছাপে নিজেরে চেনা..." এখানে ‘চেনা’ শব্দটার উপর গুরুত্ব দিয়ে প্রথমবারের মতো কোন কিছু সম্পর্কে অবগত হওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে প্রশ্ন করতে চাই। যেহেতু ধারণাটা আপনার নানা কাজে ঘুরেফিরে প্রায়ই আসছে।
 স্যাগানঃ : প্রায় এক মিলিয়ন বছর আগে কোন শ্যামল তৃণভূমির উপর ছোট্ট কম্যুনিটিতে আমাদের যাত্রা শুরু। সময়টা ছিল পশু শিকার, সন্তান জন্ম দেয়া এবং সমৃদ্ধ সামাজিক, যৌন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন গড়ার। কিন্তু চারপাশ সম্পর্কে তখন প্রায় কিছু জানতাম না। তারপরও চেনার তাগিদটা ছিল, যার জন্যে মিথের উদ্ভব। মিথগুলা জগতের গঠন সম্পর্কে একটা কল্পিত ধারণা দিত, তখনকার ব্যাখ্যাবিশ্লেষণগুলো ছিল যা জানতাম তার উপরে ভিত্তি করেই। আমরা কাহিনী বানাইলাম নানারকম। যেমন ধরেন : বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের উৎপত্তি মহাজাগতিক ডিম থেকে, কিংবা মহাজাগতিক দেবদেবীদের মিলনের ফলে অথবা কোন শক্তিশালী সত্তার হুকুমে। তবে সেগুলো নিয়ে সম্পূর্ণ সন্তুষ্টি আমাদের ছিল না। সে কারণে মিথের সীমানা বড় করা শুরু করলাম। একসময় সেই রাস্তা ধরে আগাতে আগাতে আবিষ্কার করলাম- মহাবিশ্বের গঠন এবং নানা বস্তুর উৎপত্তি আসলে সম্পূর্ণ ভিন্ন উপায়ে।
হয়তো সেইসব মিথের বোঝা এখনো বয়ে বেড়াচ্ছি, এবং বলতে গেলে প্রাচীন মিথগুলা নিয়ে কিছুটা বিব্রতও। তবে আমরা তাদেরকে সম্মান করি। কারণ তাদের চেনার তাগাদাই আজকের আধুনিক, বৈজ্ঞানিক মিথের দিকে ধাবিত করছে। প্রথমবারের মতো এখন জানার সুযোগ আছে কীভাবে মহাবিশ্বের সৃষ্টি, যেটা আগেকার বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি বিষয়ক প্রত্যাশার সম্পূর্ণ বিপরীত। এটা বিশ্বের ইতিহাসের খুব ক্রিটিক্যাল সময়।        
প্রশ্ন : অন্বেষণকারী হিশেবে মহাবিশ্বকে নিজের কাছে ব্যাখ্যা করার জন্যেই মানবজাতি অস্তিমান- এলিয়টের উদ্ধৃতিটা এমন ধারণা দেয় বলেই মনে হয়।
কার্ল স্যাগান : একেবারে ঠিক। আমরা এই মহাবিশ্বের প্রতিনিধি। হাইড্রোজেন অ্যাটমকে পনেরো বিলিয়ন বছরের মহাজাগতিক বিবর্তনের সময় দিলে এটা কী করতে পারে, আমরা তার উদাহরণ। চিন্তাটা বিহ্বল করে দেয়। সকল মানুষের উৎপত্তি, কম্যুনিটি, জাতি, মানবপ্রজাতির শুরুয়াদ, আমাদের পূর্বপুরুষ কারা ছিলেন, প্রাণসৃষ্টির রহস্য- এসব দিয়েই ঔৎসুক্যের শুরু। পৃথিবী, সৌরজগৎ, গ্যালাক্সি কই থেকে আসলো- এসব প্রশ্ন তো গভীর তাৎপর্য বহন করে। এগুলা প্রত্যেক সংস্কৃতির ফোকলোর, মিথ, অপবিশ্বাস এবং ধর্মের মূলগত বিষয়। কিন্তু প্রথমবারের মতো আমরা প্রশ্নগুলার উত্তরের দ্বারপ্রান্তে। তার মানে এই না যে চূড়ান্ত উত্তরটা পেয়ে গেছি। অনেক ব্যাপার নিয়েই এখনো রহস্যময়তা, দ্বিধাচ্ছন্নতায় ঘুরপাক খাচ্ছি। এবং আমি মনে করি, সেটাই আমাদের নিয়তি। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সবসময়ই আমাদের বোঝার ক্ষমতার চেয়ে ঐশ্বর্যময় থাকবে।
উদাহরণস্বরূপ জুপিটারের সবচেয়ে বড় চাঁদগুলার একটা ‘ঈও’-র কথা বলা যায়। ‘ঈও’ সতেরো শতাব্দীর আগ পর্যন্ত অনাবিষ্কৃত ছিল। ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত এটা সবার কাছে ছিল আলোকবিন্দু মাত্র। সামান্য কয়েকজন জ্যোতির্বিদ, যাদের কী না বড় টেলিস্কোপের সুবিধা ছিল, তারা ‘ঈও’- র সারফেসের ক্ষীণ বর্ণিলতা দেখতে পারতেন। কিন্তু এখন হাজার হাজার ডিটেইল্ড ছবি আছে, যেগুলো কিলোমিটারবিস্তৃত বৈশিষ্ট্যগুলা দেখাতে পারে। ঘটনাটা হচ্ছে একটা দুনিয়া সম্পর্কে অজানা থেকে জ্ঞানের বিশাল ধাপে উন্নীত হওয়া। যাই হোক, সেটা মাত্র একটা দুনিয়া। তারপর আরও বিশটা গ্রহ এবং চাঁদের ছবি আমরা তুলছি। বিশটা নতুন দুনিয়া!  
প্রশ্ন : ফ্রয়েড মুহূর্তটা সম্পর্কে বলতে গিয়ে শিশুর প্রথমবারের মতো আয়নার নিজেকে দ্যাখার সাথে তুলনা করছেন। 
 স্যাগান : রূপকটা চমৎকার। মাত্রই আমরা আয়নাটা আবিষ্কার করছি, এবং নিজেদেরকে দূর থেকে দেখতে পারতেছি।
প্রশ্ন : ‘কসমস’  সিরিজে আপনি বলছেন- বিশ্বজগত যে বোধগম্য সেটা খ্রিস্টপূর্ব ছয় শতক থেকেই গ্রিস জানতো।
স্যাগান : আমার জানাশোনা বলে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড যে দেবদেবীদের কোন খেয়াল বা ইচ্ছার অধীনে না, বরং মানুষের বোধগম্য সাধারণ প্রাকৃতিক সূত্র দ্বারা পরিচালিত- ষষ্ঠ শতাব্দীর আইয়োনিয়াই সর্বপ্রথম ব্যাপারটাকে গ্রহণ করে নিছিল। নিজেকে ধ্বংস করার ভয়াবহ বিপদে আছে সভ্যতা। 
১৯৬০ সালের পর পৃথিবীর সম্পূর্ণ ছবিটা তোলা হয়, এবং সবাই দেখতে পায়, ছোট্ট একটা বল মহাশূন্যে ভাসতেছে। আমরা উপলব্ধি করলাম : বহুদূরে ভিন্ন আকৃতি, রঙ আর গঠনের এরকম অনেক সাদৃশ্যপূর্ণ বিশ্ব ছিল এবং অনেকগুলার মধ্যে পৃথিবীও একটা। আমার মনে হয়, এই মহাজাগতিক পরিপ্রেক্ষিতের প্রায় পরস্পরবিরোধী এবং একই সাথে শক্তিশালী  দুইটা লাভজনক দিক আছে- এক. আরও অনেক পৃথিবীর মতো আমাদের এই পৃথিবী, এবং দুই. এই পৃথিবীর নিয়তি নির্ভর করতেছে আমাদের উপরেই।   
প্রশ্নঃ আপনি প্রায়ই রাশান বিজ্ঞানী কে ই শলকভস্কির বক্তব্য উদ্ধৃত করেন : পৃথিবী মানবজাতির দোলনা, কিন্তু কেউ দোলনায় সারাজীবন পার করে দিতে পারে না।
স্যাগান : পৃথিবী বসবাসের অযোগ্য হয়ে গেলে অন্য কোথাও চলে যেতে হবে- এরকম প্রস্তাবনায় আমার বিন্দুমাত্র সায় নাই। অর্থনৈতিক এবং নৈতিক দিক থেকে এটা খুব অজ্ঞতাপ্রসূত চিন্তা।  তথাপি এও সত্য যে, মা-পৃথিবী ছেড়ে গ্যালাক্সির অন্য কোথাও গিয়ে ভাগ্যান্বেষণ  মানবপ্রজাতির পরিপক্বতার লক্ষণ। কিন্তু কোনভাবেই পৃথিবীকে ত্যাগ ক’রে না। আমরা যদি নিজেদের বসতবাড়িকেই