"/> অন্তর্জাল
আরব বিশ্ব, ট্রাম্প, সৌদি আরব
মুসলিম ওয়ার্ল্ডঃ ট্রাম্পের ভুল হিসাব
একেএম জাকারিয়া -05/29/2017





ট্রাম্প তার এব্রাহামিক ধর্মীয় অঞ্চল সফরের অংশ হিসেবে জেরুজালেম আর ভ্যাটিকান সিটিতেও গিয়েছেন। কিন্তু ঐ শহরগুলো থেকে, সমগ্র ইহুদি কিংবা খ্রিষ্ট ধর্মীয়দের উদ্দেশ্য করে বক্তৃতা করা তার পক্ষে সম্ভব হবে না। যদিও ইসরায়েল মর্ডান জায়োনিস্ট ন্যাশনস্টেট,কিন্তু সকল ইহুদিদের প্রতিনিধিত্ব করেনা।


সলাম ধর্মের শান্তিপূর্ন বোঝাপড়া মুসলিমদের মাঝে প্রমোট করতে/তাদেরকে টেরোরিস্টদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থানে রাখার লক্ষে,গত রবিবার সৌদিআরবের রাজধানী রিয়াদে এক বক্তৃতায় ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমি আমার বিদেশ সফর শুরু করেছি মুসলিম ওয়ার্ল্ডের প্রাণকেন্দ্র থেকে’।

যেহেতু মুসলিম ওয়ার্ল্ড কোন নির্দিষ্ট ভূখন্ড নয়,সে বিবেচনায় সৌদি আরবের রিয়াদকে মুসলিম ওয়ার্ল্ডের প্রাণকেন্দ্র ধরা মানে হিসাবে ভুল। আমেরিকায় মুসলিম ব্যান করার যে সিদ্ধান্তটি কোর্টে ঝুলে আছে,তার পেছনের প্রেক্ষাপট তৈরিতে বলা হয়েছে, ইসলাম আমেরিকানদের ঘৃণা করে। যেহেতু দূরবর্তী ইস্টের এক মরুপ্রান্তর থেকে এই ধর্ম এসেছে তাই প্রকৃত আমেরিকানদের ধর্ম ইসলাম হতে পারেনা,তাই আমরা এ ধর্মের কর্মকান্ড মার্কিন ভুখন্ডে ব্যান করতে পারি। মজার ব্যাপার হলো, স্টিফেন মিলার, যিনি ইসলাম ব্যান প্রক্রিয়ার মূল হোতা, তিনিই আবার ট্রাম্পের রিয়াদ বক্তৃতার অন্যতম লেখক।নিঃসন্দেহে বলা যায়,ত্রুটিপূর্ন আর বর্নবাদি ওয়েস্টার্ন আইডিয়ার ভিত্তিতেই ধারণা করা হয়েছে,মুসলিমরা তাঁদের নিজস্ব একটা ওয়ার্ল্ডে বাস করে।

যদি প্রিমর্ডান কন্সেপ্ট অনুসারে মুসলিম অধ্যুষিত ভূখন্ডগুলোকে মুসলিম ওয়ার্ল্ড বলা হয়,তাহলে সেখানে দেখা যাবে এখন মুসলিমরা ন্যাশনাল মাইনরিটি। এমনকি পাকিস্তান আর আফগানিস্তানকে যদি মিডল ইস্ট ধরে ভুল না করা হয়,তাহলে দেখা যাবে ৮০% মুসলিম মিডল ইস্টের বাইরে বসবাস করেন,যারা সংখ্যায় ১.৬ বিলিয়ন,এর মধ্যে আমেরিকান মুসলিমরাও রয়েছেন।

ট্রাম্প তার এব্রাহামিক ধর্মীয় অঞ্চল সফরের অংশ হিসেবে জেরুজালেম আর ভ্যাটিকান সিটিতেও গিয়েছেন। কিন্তু ঐ শহরগুলো থেকে,সমগ্র ইহুদি কিংবা খ্রিষ্ট ধর্মীয়দের উদ্দেশ্য করে বক্তৃতা করা তার পক্ষে সম্ভব হবে না। যদিও ইসরায়েল মর্ডান জায়োনিস্ট ন্যাশনস্টেট,কিন্তু সকল ইহুদিদের প্রতিনিধিত্ব করেনা। একইভাবে,ভ্যাটিকান গ্লোবাল ক্যাথলিক নেটোয়ার্কের প্রানকেন্দ্র হতে পারে কিন্তু সমগ্র খ্রিষ্টান কমিউনিটির প্রতিনিধি নয়।
সৌদিআরবের ক্ষেত্রেও একই হিসাব প্রযোজ্য,সৌদিরাজতন্ত্র কোনভাবেই সমগ্র মুসলিমদের মুখপাত্র নয় বরং সৌদি সীমানা সংলগ্ন মুসলিম রাষ্ট্রগুলো তাঁদের ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত দিনাতিপাত করছে।এমনকি মক্কায় পবিত্র হজব্রত পালন করতে এসে সারা পৃথিবির মুসলিমরা দেখে যান,কিভাবে সৌদি সরকার তাঁদের ধর্মের পবিত্রতম স্থানগুলোতে হোটেল,ফাস্টফুড চেইন আর শপিংমল বসিয়ে বানিজ্যিকীকরন করছে।এছাড়াও সৌদিআরবের প্রত্যক্ষ মদদে ইয়েমেনে বোমাহামলা ও মানবিক ত্রানসাহায্য বন্ধের ঘটনা সারাবিশ্বের সাধারণ মুসলিম/হিউম্যান রাইটস এক্টিভিস্টদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কায়রো বক্তৃতার মতোই,ট্রাম্পের রিয়াদ বক্তৃতা নিয়েও সারাবিশ্বের মুসলিমরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন।যদিও প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের ওয়ার অন টেরর ঘোষনার পরবর্তীতে ওবামার কায়রো বক্তৃতায় মুসলিমরা অন্ততপক্ষে আশাবাদি হয়েছিলেন যে আমেরিকা ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামেনি।কায়রো বক্তৃতার প্রতিটা শব্দই ওবামা নিজে এবং তার বক্তৃতার লেখক রাশাদ হুসাইন বারংবার যাচাই বাছাই করেছিলেন।ওবামার কায়রো বক্তৃতা পোস্টকলোনিয়াল দুনিয়ায় গনতন্ত্র,স্বাধীনতা এবং সাম্যাবস্থার আশা জাগিয়েছিল নিঃসন্দেহে।তাই,রমজানের শুরুতে কায়রোরের খেজুর ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে রসালো খেজুরের নাম ওবামা আর শুষ্ক খেজুরের নাম বুশ রেখেছিলেন।

ট্রাম্পও রমজানের আগে রিয়াদ বক্তৃতা দিলেন,নিশ্চয়ই এ বক্তব্যের চুলচেরা বিশ্লেষন হবে।যদিও তার সিদ্ধান্ত,তার বক্তব্যের তুলনায় জোড়ালো।ট্রাম্প কেবল ইয়েমেন সিভিলিয়ানদের উপর সৌদি হামলাকে সমর্থনই করেননি,তাদের পুরষ্কৃতও করেছেন।তিনি সৌদিআরবের সাথে ১১০বিলিয়ন ডলারের এক অস্ত্র বিক্রয় চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন।যদিও ট্রাম্প তার রিয়াদ বক্তৃতায় শান্তি স্থাপন এবং উদ্বাস্তু সংকট নিরসন সম্পর্কে বলেছেন,কিন্তু ইয়েমেন যুদ্ধই পৃথিবীতে পরবর্তী উদ্বাস্তু সংকট সৃষ্টি করতে যাচ্ছে।দেখা যাচ্ছে তার পদক্ষেপ,তার বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সফরে উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে একটি জয়েন্ট গ্লোবাল সেন্টার চালু হয়েছে।সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইকে তিনি সকল ধর্মের সুন্দর মানুষ,সুন্দর জীবন প্রত্যাশীদের সাথে বর্বর অপরাধীদের লড়াই বলেছেন। অটোক্রাটিক মুসলিম নেতাদের ভূয়সী প্রশংসা করার মাধ্যমে ট্রাম্প বুঝিয়ে দিয়েছেন যে কিসের ভিত্তিতে তিনি সুন্দর/ভালো/মডারেট মুসলিমদের পৃথক করছেন।মডারেট মুসলিম মূলত অন্ধবিশ্বাসে মার্কিন সরকারের প্রনীত ইসলামের একটা ভার্সন মেনে নেয়া মুসলিম।মডারেট মুসলিমের ট্রাম্পের সৌদি সফর নিয়ে কোন অভিযোগ/প্রতিবাদ নেই।
সেকারনেই মডারেট মুসলিম এর মতো একটা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভেতর আমি ভূত দেখি এবং কোন বাছবিচার ছাড়াই নিজেকে র‍্যাডিকেল মুসলিম হিসেবে পরিচয় দিই।আমি আগেও লিখেছি,যদিও র‍্যাডিকেল মুসলিমদের হন্তারক এবং টেরোরিস্ট হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া হচ্ছে,কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মুসলিমদের মধ্যে যারা সামাজিক ন্যায়বিচার প্রত্যাশি,বর্নবাদ বিরোধি,নারীর ক্ষমতায়নের পক্ষে,সাম্রাজ্যবাদ বিরোধি,শান্তির স্বপক্ষে তাঁরা নিজেদের র‍্যাডিকেল মুসলিম বলছেন।আবার মোহাম্মাদ আলীর মতো র‍্যাডিকেলদের আরেকটা ধারা আছে যারা মার্কিন সরকার এবং জংগী গ্রুপগুলো উভয়ের পলিসিকেই অস্বীকার করে।সৌদি আরবের র‍্যাডিকেল মুসলিমদের মধ্যে তরুন মুসলিম ফেমিনিস্ট এবং প্রতিশ্রুতিশীল মুসলিম,যারা রাজনৈতিক সংস্কার এবং শান্তির জন্য লড়াই করছেন,তারা আমাকে আশার আলো দেখাচ্ছেন।

যদিও অনেক ওয়েস্টার্ন বিশ্লেষক ট্রাম্পের রিয়াদ বক্তৃতায় ইসলামের প্রতি নরম সুরের প্রশংসা করেছেন,কিন্তু আমি এর মধ্যে রাজনৈতিকভাবে অর্থপূর্ন কোন ফ্যাক্ট খুঁজে পাইনি যার ভিত্তিতে বলা যায় ট্রাম্প তার নির্বাচনকালিন অবস্থান থেকে সরে এসেছেন।বরং এই বক্তৃতা তার সৌদি হোস্টদের প্রতি অস্ত্র,তেল বিপনন চুক্তি পরবর্তী লোকদেখানো সম্ভাষণ।

ট্রাম্পের সেই ভয়ংকর ফ্যান্টাসি ভুলে গেলে চলবে না,যেখানে তিনি ভায়োলেন্সকে আমেরিকার সীমানা থেকে তাড়িয়ে মুসলিম ওয়ার্ল্ডের রাস্তা দেখিয়ে দেবেন আর জব,ডলার আরএবং তেল টেনে নেবেন আমেরিকার সীমানায়। যদি আমেরিকার দিকে ভায়োলেন্স তেড়ে আসে তবে সীমানারেখাতেই তা আটকানো হবে এবং সেক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখবে মুসলিম ব্যান প্রকল্প।

আমেরিকা ততদিনই মুসলিম ওয়ার্ল্ড বলতে থাকবে,যতদিন দূর থেকে মুসলিমরা আমেরিকান ইন্টারেস্টের স্বপক্ষে কাজ করবে,কিন্তু নিকটবর্তী হবে না।
 

সূত্র: আটলান্টিক অবলম্বনে।



একেএম জাকারিয়া
লেখকঃ অন্তর্জাল.কম