"/> অন্তর্জাল
রমজান, হোটেল
মস্ত বড় পরহেজগার মনে করা মানুষগুলোর পরহেজগারি
ওয়াহিদ জামান -05/29/2017





রোজার প্রধান উদ্দেশ্য শুধু দিনে অভুক্ত থাকা না বরং আত্মশুদ্ধি অর্জন করা,অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা,অন্তরে খোদাভীতির জন্ম দিয়ে পাপপূর্ণ ইচ্ছা থেকে নিজেকে সংযত রাখা। নিজেকে সংযত রাখা খাবার অপচয় করা থেকে,খারাপ কাজ থেকে,কথা ও কাজে অন্যকে কষ্ট দেয়া থেকে।


ত রমজানের কথা। রোজা রেখেই জাহাজ থেকে ১ দিনের ছুটিতে বাড়ির দিকে রওয়ানা দিয়েছি।

সমুদ্র বেশ উত্তাল ছিল। প্রায় ১০ কিলোমিটার সমুদ্রের ভিতরে থাকা জাহাজ থেকে স্পিডবোটে পতেঙ্গা সি বীচে আসতেই আমার অবস্থা কাহিল হয়ে যায়। এরপর পতেঙ্গা থেকে প্রচণ্ড গরমে ট্রাফিক জ্যামের ভিতর দিয়ে যখন বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছি তখন বেশ খিদে লেগে যায়। দিনের বাকিটা সময় খিদে নিয়ে জার্নি করতে পারবো বলে মনে হচ্ছিল না।

স্থির করলাম,হোটেল থেকে খাবার কিনে সাথে রেখে দিব।সম্ভব না হলে পথে রোজা ভেঙ্গে ফেলবো। আর সফরের হালতে তো রোজা ভাঙ্গাই যায়।

গেলাম আগ্রাবাদের জামান হোটেলে। খাবার আছে কি না জিজ্ঞেস করতেই ওয়েটার যেন আকাশ থেকে পড়লেন! তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বললাম,'ভাই,আমি এখানে বসে খেতে আসিনি। খাবার থাকলে প্যাকেট করে দেন।আমি নিয়ে যাবো। '

ওয়েটার রাগের স্বরে আমাকে বললেন,' আপনার সাহস তো কম নয়! রোজার দিন খাবারের নাম মুখে আনলেন কিভাবে? রোজা রাখেন না বলে কি লজ্জা শরমও নাই?'

আমি মেজাজ ঠাণ্ডা রেখেই বললাম,' আপনি কি জানেন আমি রোজাদার কি না? আপনি কি জানেন আমার ধর্ম কি? তো,কেন আপনি ফালতু কথা বলছেন? খাবার না থাকলে ভদ্র ভাষায় বললেই তো পারেন।'

ওয়েটার তার স্বভাবসুলভ বেয়াদবির ভঙ্গিতেই বলেন,' আমাকে ভদ্রতা শিখানোর দরকার নেই আপনার। রোজা রাখে না আবার বড় বড় কথা বলে!'

অল্প দূরে বসেই ম্যানেজার সব কথা শুনছিলেন। ম্যানেজারকে গিয়ে বললাম,' এই বেয়াদব ওয়েটারকে কিভাবে হোটেলে রেখেছেন? রোজার দিনে এই হোটেলে রান্না হয় না এটা তো বললেই হয়! এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের মানে কি?'

ম্যানেজার কিছুটা ভদ্র ভাষায় বলেন,'ভাই সাব,ভুলটা আপনিই করেছেন। রোজার দিনে খাবার চাওয়া আপনার ঠিক হয় নি। আশেপাশের কোন হোটেলেই আপনি খাবার পাবেন না। ঘুরে লাভ নেই। আপনি আসতে পারেন।'

আর কোন কথা না বলেই চলে আসলাম।মনে মনে ভাবলাম, নিজেকে মস্ত বড় পরহেজগার মনে করা এই মানুষগুলোকে পরহেজগারি শিখানোর সাধ্য আমার নেই। সংযমের মাসে কথা,কাজ,আচার আচরণের সংযম শেখানোর সাধ্য আমার নেই।

সাধ্য নেই এটা বোঝানোর যে,কেউ রোজা না রাখলেই,দিনের বেলায় খাবারের সন্ধান করলেই বা খেলেই তার সম্পর্কে আজেবাজে বলতে হয় না। অমুসলিমরা দিনের বেলায় খেতেই পারে,হোটেলে খাবারের সন্ধান করতেই পারে।

মুসলিম পুরুষ হয়েও শর্তসাপেক্ষে সফরের হালতে,বার্ধক্যজনিত কারণে,অসুস্থতার কারণে রোজা ভাঙ্গতেই পারে।মুসলিম মহিলা হয়েও শর্তসাপেক্ষে সফরের হালতে,অসুস্থতার কারণে,গর্ভবতী হওয়ার কারণে,বাচ্চাকে দুগ্ধ পানে সমস্যার কারণে রোজা ভাঙ্গতেই পারেন। এতে রোজা ভঙ্গকারী সম্পর্কে না জেনেই খারাপ ধারণা পোষণ করা যেমন উচিৎ নয় তেমনি 'কেন রাখেন নি? কি সমস্যা? ' এ জাতীয় প্রশ্ন করাও উচিৎ নয়।

রোজার প্রধান উদ্দেশ্য শুধু দিনে অভুক্ত থাকা না বরং আত্মশুদ্ধি অর্জন করা,অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা,অন্তরে খোদাভীতির জন্ম দিয়ে পাপপূর্ণ ইচ্ছা থেকে নিজেকে সংযত রাখা। নিজেকে সংযত রাখা খাবার অপচয় করা থেকে,খারাপ কাজ থেকে,কথা ও কাজে অন্যকে কষ্ট দেয়া থেকে।

প্রতিটি রোজাদারের অন্তর ভরে উঠুক তাকওয়ার গুণে,গড়ে উঠুক বে-রোজাদারের প্রতিও সহনশীল মনোভাব,গড়ে উঠুক পাপাচারমুক্ত সুশৃঙ্খল-শান্তিপূর্ণ সমাজ।



ওয়াহিদ জামান
লেখক, মেরিন ইঞ্জিনিয়ার