"/> অন্তর্জাল
চাল, রফতানি, আমদানি, উৎপাদন, মজুদ, বাজার
বাচ্চালোক তালিয়া বাজাও, আমরা আবার ফার্স্ট হয়েছি
আবুল হাসান রুবেল -05/28/2017





এই যে বিভিন্ন ধরনের তথ্য সরকারের হাতে নাই, দৃশ্যত বাজারের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ নাই; এগুলো একদিকে তাদের নয়া উদারতাবাদী অবস্থানের সাথে সম্পর্কিত, অন্যদিকে তাদের অক্ষমতারও প্রকাশ। বাংলাদেশ পুরোপুরি বাজার অর্থনীতির নিয়মে চলে এমন নয়, বরং রাষ্ট্র অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে এখানে একটা শক্তিশালী খেলোয়াড়।


বাচ্চালোক তালিয়া বাজাও। আমরা আবার ফার্স্ট হয়েছি। এবার মোটা চালের দামে।আমরা কত্ত বড়লোক হয়ে গেছি, তাই না? সবচেয়ে বেশি দামে চাল কিনে খাই! দেশে উন্নয়নের গতি দিনকে দিন ত্বরান্বিত হচ্ছে।কৃষি ক্ষেত্রে তো একেবারে উন্নয়নের শিখরে, অন্যদের জন্য ঈর্ষণীয় সাফল্য আমাদের। একেবারেই আমার বানানো কোন কথা না , মন্ত্রীরা যা বলেছেন সেটাই বলছি কেবল। তাহলে কেমনে কি? এত দাম! উন্নতি কি হয়নি? এটা আসলে সার্কাজমও নয়, সত্যিই যে উন্নতি হয়েছে তারই প্রতিফলন আমরা দেখছি এই দাম বৃদ্ধিতে।

বিষয়টা আরেকটু খোলাসা করা যাক। প্রথম আলো পত্রিকায় ইফতেখার মাহমুদের প্রতিবেদনে ৪টি কারণের উল্লেখ আছে। ১. সরকারের গুদামে চালের মজুদ ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।২. ব্যবসায়ীদের হাতে চালের কি পরিমাণ মজুদ আছে তার তথ্য সরকারের কাছে নাই।৩. চালের উৎপাদন ও ভোগের সমন্বিত তথ্য সরকারের হাতে নাই, চাল রফতানি করা হয়েছে, আমদানি নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।৪. চালের উৎপাদন খরচ বেড়েছে, কৃষক ভাল দাম পায়নি ফলে অন্য ফসলে চলে গেছে। দৈনিক পত্রিকার প্রতিবেদন হিসাবে সাধারণত আপাত কারণগুলোকেই তুলে আনা যায়, এখানে সেটাই করা হয়েছে। কিন্তু এগুলোকে আরেকটু গভীরভাবে দেখা দরকার এবং সেটা দেখতে গেলে আরও বেশ কিছু কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে।

প্রথমেই বলে নেয়া ভাল এই যে বিভিন্ন ধরনের তথ্য সরকারের হাতে নাই, দৃশ্যত বাজারের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ নাই; এগুলো একদিকে তাদের নয়া উদারতাবাদী অবস্থানের সাথে সম্পর্কিত, অন্যদিকে তাদের অক্ষমতারও প্রকাশ। বাংলাদেশ পুরোপুরি বাজার অর্থনীতির নিয়মে চলে এমন নয়, বরং রাষ্ট্র অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে এখানে একটা শক্তিশালী খেলোয়াড়। সরকারের চালের বাজার প্রভাবিত করার নীতিও আছে। কিন্তু সরকারের হাতে তথ্য নাই, তার প্রভাবিত করার মত মজুদ চাল নাই, এটা তার ব্যর্থতার প্রকাশ। সরকার এমন অনেকক্ষেত্রেই ব্যর্থ হচ্ছে প্রশ্ন ফাঁস রোধে ব্যর্থ হচ্ছে, নারীর নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে, জনগণের জীবনের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে, দুর্ণীতি দমনে ব্যর্থ হচ্ছে, পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে ব্যর্থ হচ্ছে, এরকম আরও যত জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় আছে সেগুলোতে ব্যর্থ হচ্ছে। মূলত সরকারের ক্ষমতার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত নয় এমন বিষয়গুলোতে তার ব্যর্থতা প্রকট। আবার ক্ষমতা ধরে রাখার সাথে সম্পর্কিত এরকম বিষয়ে সরকারের সাফল্য প্রশ্নাতীত। সেটা ক্ষমতার সাথে যুক্ত বিভিন্ন পক্ষকে খুশি করা হোক আর প্রতিপক্ষ দমন করা হোক। ফলে অনুমান করে নেয়া যায় যে চালের প্রশ্নটাকে তারা ক্ষমতার প্রশ্ন আকারে নয়, বরং দেখছে জনস্বার্থের প্রশ্ন আকারে এবং সেখানে ব্যর্থতাকে অনুমোদনযোগ্য হিসাবে দেখা হচ্ছে। প্রথম তিনটি পয়েন্টই আসলে এটার সাথে যুক্ত।

চতূর্থ প্রসঙ্গটি শুধুমাত্র সরকারের সাথে যুক্ত নয়, এটা সামগ্রিকভাবে কৃষি ব্যবস্থার সাথে যুক্ত। যদিও সেখানেও সরকারের ভূমিকা আছে। এর সাথে সম্পর্কিত আগের সরকারগুলোও। কৃষি উৎপাদনের খরচ বৃদ্ধির কারণ কৃষির রূপান্তর । অধিক রাসায়নিক সার, বালাই নাশক, আগাছা নাশক, অধিক সেচ নির্ভর হাইব্রিড, উচ্চ ফলনশীল বীজ ব্যবহার। ফলাফলে কৃষির অধিক জ্বালানি নির্ভরতা। এসবের ফলে কৃষির উৎপাদন খরচ দিনের পর দিন বাড়ছে। ক্রমাগত অধিক হারে সারের প্রয়োজন হচ্ছে, কীটনাশকের প্রয়োজন বাড়ছে, বীজ নিস্ফলা হয়ে যাচ্ছে। কৃষি আর কৃষকের নাই, হয়ে গেছে কোম্পানির মুনাফার হাতিয়ার। এর সাথে যুক্ত আছে বাজারে কৃষকের সরাসরি সীমিত প্রবেশাধিকার। ফলে সবমিলিয়ে বাড়ছে উৎপাদন খরচ কিন্তু কৃষক তার ফসলের দাম পাচ্ছে না।

এই রূপান্তর কিভাবে গোটা কৃষিকেই বিপর্যস্ত করছে তার নমুনা এবার আমরা বিভিন্ন স্থানে দেখেছি। সেটা আরেক আলোচনা। কিন্তু ইতিমধ্যেই চালের যা দাম বেড়েছে তা কিন্তু এই বিপর্যয়ের ফলাফল পুরোপুরি হাজির হবার আগেই। ফলে চালের দাম এখন যা আছে তাও আরও বাড়বে। আর সরকার যে চাল কিনবে বাইরে খেকে সেখানেও সে মুনাফা করবে না, সেটা তেলের দাম নিয়ে সরকারের কর্মকান্ড দেখার পরে আস্থার সাথে বলা যায় না। আর সবচেয়ে বড় কথা তা কৃষকের অবস্থার খুব হেরফের করবে না।



আবুল হাসান রুবেল
লেখক, বিশ্লেষক
অন্তর্জাল.কম