"/> অন্তর্জাল
সিনেমা
‘আব্দুল্লাহ সাদ’, আ লোন ফ্লাওয়ার ইন দ্যা ডেজারট!
আরিফুর রহমান -11/11/2016





 

০১০ সালের কথা, ইংল্যান্ডের শেফিল্ড ডকুমেন্টারি ফেস্টিভ্যালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করবো ‘ওয়েটিং ফর গডো’ নিয়ে তাই খুবই উত্তেজিত ছিলাম। আমার যে উচ্চতা ভীতি আছে সেটাও মনে ছিল না! আকাশে উঠা মাত্রই একমাত্র যে গানটা আমার মনে পড়েছিল সেটা হল ‘ফান্দে পরিয়া বগা…! পকেটে তিনশো পাউনড, প্রতি তিন মিনিট পর পর একবার করে দেখি টাকাটা আছে তো! কারণ আমার টাকা হারানোর বাতিক ছিল! কিন্তু এটা তো নীলক্ষেত না যে গরম ধোঁয়া ওঠা তেহারি খেয়ে দেখবো পকেটে টাকা নাই, তারপর বন্ধু এফ রহমান হল থেকে এসে আমাকে উদ্ধার করবে! এমন একটা টেনশন মাথায় নিয়েই উপস্থিত হলাম ম্যানচেস্টার শহরে। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি, হাড় কাঁপানো শীত। ট্রেন ধরে যেতে হবে শেফিল্ড, হাতে প্রিন্ট করা ম্যাপ; সারাজীবন ভূগোলের সাথে যার ছিল আড়ি! আমি একা বাংলা মায়ের সন্তান ভূগোল গুলে খেয়ে নানা পথ ঘুরে মধ্যরাতে উদ্ভ্রান্তের মতো গিয়ে হাজির হলাম হোটেলে! সাতটা দিন! হোম সিকনেস কাকে বলে কত প্রকার কি কি টের পেল আমার কচি মন! আমি যে কতটা ভেতো সেটাও বোঝা গেলো তখন! চোখে মুখে শুধু একটাই স্বপ্ন, সাদা ধবধবে গরম ভাত-একটু ঘি-আলু ভর্তা আর ডাল! মোটা মোটা বার্গারগুলো দাঁত কেলিয়ে থাকতো টেবিলে! পকেটের টাকা ভেঙ্গে সিম আর টক টাইম কিনে মাকে ফোন দিলাম, ‘মা ভাত খাবো’! দেশে ফিরে বাসায় এসেই প্রথম গরম ভাতের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম! আমার চারপাশে সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে দেখল সে এক অন্য ‘আমি’, বড্ড ভেতো! কিন্তু সেই তৃপ্তি এখনো ভুলতে পারি না! ২০১০ সালের পুরনো সেই গল্পটা আজ পাড়লাম কারণ আমার ভাত খাবার তৃপ্তিকর সেই অনুভূতির সাথে সম্প্রতি একটা ছবি দেখার তুলনা খুঁজে পেলাম! ছবিটির নাম ‘লাইভ ফর্ম ঢাকা’, যিনি বানিয়েছেন তাঁকে আমি শিল্পী ছাড়া আর কিছু বলতে পারবোনা! আমার সৌভাগ্য তাঁর সাথে আমার দেখা হয়েছে! ‘আব্দুল্লাহ সাদ’, আ লোন ফ্লাওয়ার ইন দ্যা ডেজারট! আমি তাঁকে এভাবেই চেনাতে চাই, কারণ তিনি নিভৃতচারী, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁকে খুঁজে পাবেন না, খুঁজে পাবেন না কোন ডামাডোলে। এই শহরে এই সমাজেই তাঁর বসবাস, শুনলে আরও অবাক হবেন; তিনি পেশায় একজন বিজ্ঞাপণ নির্মাতা! আমাদের এই সিনেমার মরুভূমিতে এই লোন ফ্লাওয়ার খুব ইম্পরট্যান্ট ফ্যানমেনন। কারণ আমরা যারা মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান পকেটে সিনেমা বানানের স্বপ্ন নিয়ে ঘুরি, তারপর দুটা নাটক; তিনটা বিজ্ঞাপন বানানোর পর টাকা রাখতে গিয়ে পকেট খালি করতে হয় বিধায় আলগোছে সিনেমাটাকেই ফেলে দেই! তাদের কাছে এই ফ্যানমেনন খুবই ইম্পরট্যান্ট! সিনেমা খুব একটা কস্টলি মিডিয়া ভাই, প্রতি সেকেন্ডে সেকেন্ডে ঘড়ির কাঁটা ঘোরার মত এখানে টাকা খরচ হয়! সেখানে একটা আস্ত সিনেমা বানিয়ে ফেলেছেন তিনি, কারো কাছে হাত পাতেন নি, বিজ্ঞাপন বানিয়ে সব টাকা দিয়ে শুধু ভাত খান নি; সেই টাকায় সিনেমা বানিয়েছেন! তাঁর নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের নাম ‘খেলনা ছবি’। আমি স্যালুট জানাই ‘খেলনা ছবি’র প্রত্যেকটা সদস্যকে যারা খেলনা ছবি নয় বানিয়েছেন একটা সত্যিকারের ছবি। ছবিটি সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক চলচিত্র উৎসবের প্রতিযোগীতা বিভাগে লড়ছে। বাংলাদেশে আমাদের জন্যও একটা লড়াই অপেক্ষা করছে সামনে। শতভাগ নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত এই ছবিটিকে সিনেমা হল পর্যন্ত নিয়ে আসা এবং প্রত্যেকে সিনেমা হলে গিয়ে ছবিটি দেখা। যেন এই ছবিতে লগ্নী করা প্রতিটি কানা কড়ি উঠে আসে এবং খুব শীঘ্রই তিনি তাঁর পরের ছবির কাজ শুরু করতে পারেন। আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব সাদে’র মত মরুভূমির এই সব লোন ফ্লাওয়ারদের বাড়তে দেয়া। সেদিন আর দেরি নয় যখন এই মরুভূমি ফুলে ফুলে ভরে উঠবে।
ছবির ট্রেইলার:

 



 আরিফুর রহমান