"/> অন্তর্জাল
নিখোঁজ তরুণ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিরোধী পক্ষ, জঙ্গিবাদ
কারা ধরছে? কারা ছাড়ছে?
নুরুজ্জামান লাবু -06/02/2017





তাদের জোর করে তুলে নিয়ে চোখা বেঁধে রাখা হয়েছে। আবার গাড়ীতে করে ফিরিয়ে দেয়ার কথাও নয়। কেউ ফিরে আসতে চাইলে তাকে পালিয়ে আসতে হবে। বিষয়টি সহজেই অনুমেয় যে, তাদের কেউ না কেউ ধরে নিয়েছিল।


সাড়ে সাত মাস পর বাড়ি ফিরেছে ডা. ইকবাল মাহমুদ। গত বছরের ১৫ অক্টোবর মধ্যরাতে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরী এলাকা থেকে তাকে তুলে নিয়ে যায় অজ্ঞাতপরিচয় (!) ব্যক্তিরা। ৩১ মে তাকে বাসার সামনে নাময়ে দিয়ে যায় তারা। বাসায় ফেরার পর তিনি বলেছেন, কারা তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল তা তিনি জানেন না। কেন তাকে তুলে নেয়া হয়েছিল তাও জানানো হয়নি। বেশিরভাগ সময় তার চোখ বাঁধা ছিল। অন্ধকার ঘরে রাখা হয়েছিল তাকে। সেখানেই এই সাড়ে সাত মাস থেকেছেন-খেয়েছেন। আর প্রতিটি মুহুর্ত কাটিয়েছেন অজানা আতঙ্কে।

গত বছরের নভেম্বরের শেষে এবং ডিসেম্বরের প্রথম দিকে ঢাকার বনানী, ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে ৬ তরুণ নিখোঁজ হয়। এদের মধ্যে গত মাসের ১৮ এপ্রিল একজন ফিরে এসেছে। তাকে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা, যারা তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল, তারা সাভারের নবীনগরে জাতীয় স্মৃতিসৌধের কাছে মাইক্রোবাসে করে নামিয়ে দিয়ে যায়। নামিয়ে দেয়ার আগে তার পকেটে কিছু টাকাও দেয়া হয়, যাতে সে বাড়ি ফিরতে পারে। এই তরুণও জানিয়েছে, কারা এবং কেন তাকে তুলে নেয়া হয়েছিল তা তিনি বলতে পারেননি।

বছর দুয়েক আগের কথা। এরকম এক তরুণের সঙ্গে আমি নিজে কথা বলেছিলাম। মিরপুর চিড়িয়াখানা এলাকার নিম্নবিত্ত পরিবারের এক তরুণ ৮ দিন নিখোঁজ থাকার পর তাকে মাইক্রোবাসে নামিয়ে দেয়া হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে তাকে তুলে নিয়ে যায় অজ্ঞাত ব্যাক্তিরা। তারাই আবার তাকে ফিরিয়ে দিয়ে যায়। তার কোনও অপরাধ নেই। কেন তাকে তুলে নেয়া হয়েছিল জানানো হয়নি তাও। আট দিন চোখ বেঁধে রাখা হয়েছিল তার। সেই ঘটনারও কোনও রহস্য উদ্ঘাটন হয়নি।

এরকম ঘটনা আরো অসংখ্য। হঠাৎ হঠাৎ লোকজন নাই হয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ দিন বা মাস শেষে ফিরছে। কেউ কখনোই ফিরছে না। কখনো কখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে তুলে নেয়ার অভিযোগ আসছে। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহনীর কোনও সংস্থাই তা স্বীকার করে না। কিন্তু তাদের উদ্ধারে দৃশ্যত কোনও তৎপরতাও দেখা যায় না।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে কারা এদের ধরছে? কারা তুলে নিয়ে যাচ্ছে? কারাই বা তাদের আবার ছেড়ে দিচ্ছে? কেন ধরছে? অপরাধী হলে ছেড়ে দিচ্ছে কেন? কেন আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না? নিরপরাধ হলে তাদের ধরে চোখ বেঁধে আটকে রাখা হচ্ছে কেন?

গত কয়েক বছরে আমরা ‘ফোর্স ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’-এর নানা অভিযোগ শুনেছি। বিশেষ করে রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষের লোকজনই এর শিকার হয়েছে বেশি। দু-একটি ঘটনা দেখেছি খোদ ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের ক্ষেত্রেও। কিন্তু বর্তমান সময়ে যারা হঠাৎ হঠাৎ নাই হয়ে যাচ্ছেন তাদের কারো রাজনৈতিক কোনও মতাদর্শের কথা শোনা যাচ্ছে না। কোনও কোনও ক্ষেত্রে একেবারে নিরীহ-সহজ-সরল যুবকের ক্ষেত্রে এসব ঘটনা ঘটছে।

গত দুই-তিন বছর ধরে দেশে জঙ্গিবাদের পুনরুত্থান হয়েছে। দেশীয় জঙ্গিদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়েছে উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিত তরুণেরা। গত বছর গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারীতে হামলার পর আমরা জানতে পেরেছিলাম হামলাকারীদের কেউ কেউ ছয় মাস থেকে এক বছর ধরে নিখোঁজ ছিল। গুলশান হামলার পর নিখোঁজ হওয়ার খবর বাড়তে থাকলো আরো বেশি। জঙ্গি বিরোধী অভিযানে নিহত হওয়া অনেক উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিত তরুণরা অনেকেই স্বেচ্ছায় ঘর ছেড়েছে। জঙ্গিবাদের ভাষায় যাকে ‘হিজরত’ করা বলে। এটা আতঙ্কের একটি বিষয়। হিজরতকারীরা কোনও কোন এক সময়ে নিজেদের প্রস্তুত করে হামলা চালাবে, এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। যার ফলে কেউ নিখোঁজ হলেই বা নিখোঁজ হওয়ার খবরে আমরা আতঙ্কিত হই। ভাবি, জঙ্গিরা আবার বুঝি জোরালোভাবে সংগঠিত হচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা আমাদের দ্বিধায় ফেলেছে। নতুন করে নিখোঁজ হওয়া তরুণেরা আসলেই জঙ্গিবাদের টানে ঘর ছেড়েছে নাকি কেউ তাদের তুলে নিয়েছে?

জঙ্গিবাদের টানে ঘর ছাড়ার পর ফিরে আসলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে তাদের ব্যপক জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা। তাদের কাছ থেকে সহযোগীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করার কথা। যদিও ফিরে আসা তরুণেরা যে ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছেন, তাতে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তাদের জোর করে তুলে নিয়ে চোখা বেঁধে রাখা হয়েছে। আবার গাড়ীতে করে ফিরিয়ে দেয়ার কথাও নয়। কেউ ফিরে আসতে চাইলে তাকে পালিয়ে আসতে হবে। বিষয়টি সহজেই অনুমেয় যে, তাদের কেউ না কেউ ধরে নিয়েছিল।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি-দুটি ইউনিটের প্রতি এরকম অভিযোগ অনেক আগে থেকেই। নানা ঘটনাতে তাদের এরকম অপেশাদারি আচরণ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। তবুও বারবার তাদের একই কর্মকান্ড করতে দেখা যাচ্ছে। বুঝতে পারছি না, এক ধরণের ইন্টারনাল কমপিটিশনে নিজেদের ধরে রাখতে গিয়ে তারা এমনটি করছেন কি না?

যদি আমার এই আশঙ্কা সত্যি হয়। তাহলে এটি হবে দেশের জন্য সবচেয়ে ভয়ঙ্কর একটি বিষয়। অহেতুক সাধারণ মানুষকে তুলে নিয়ে ছেড়ে দেয়ার কারণে সত্যিকার অর্থে জঙ্গিবাদের টানে হিজরতকারীদের গ্রেফতার করা হলে সাধারণ মানুষ তা বিশ্বাস করতে চাইবে না। এমনিতেই কিন্তু কিছু মানুষ জঙ্গি বিরোধী অভিযানকে বিশ্বাস করতে চায় না। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা এতে আরো আগুনে ঘি ঢেলে দেয়ার মতো অবস্থা সৃষ্টি করেছে।

আমরা চাই, যা কিছু হচ্ছে তা যেন আইনী প্রক্রিয়ার মধ্যে হয়, যেন সহনীয় পর্যায়ে হয়।

Save



নুরুজ্জামান লাবু
সিনিয়র ক্রাইম রিপোর্টার, বাংলা ট্রিবিউন