"/> অন্তর্জাল
কবিতা
জোসেফ ব্রডস্কি: টুকরো কথা
-11/11/2016





অনুবাদ: রথো রাফি


উৎসর্গ: নূর হোসেন-কে

১৯৮৭'র ১০ নভেম্বরে স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী গণআন্দোলনের এক বিক্ষোভ মিছিলে ‌'স্বৈরাচার নিপাত যাক গণতন্ত্রমুক্তি পাক'- বুকে-পিঠে এই স্লোগান লেখা  যে চিরতরুণ বুলেট বিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান।

 

ন্মেছিলাম আর বেড়ে ওঠেছিলাম আমি বাল্টিক জলাভূমিতে
দস্তারঙ ঢেউগুলো সবসময় এগিয়ে চলে যেখানে
জোড়ায় জোড়ায়। আর তাই যতো ছন্দ, নীরস ঐ বিবর্ণ কণ্ঠ
যা তরঙ্গ তুলে যায় দুইয়ের মাঝে এখনো-সিক্ত-চুলের মতো,
আদৌ তরঙ্গ তুলে যদি। ধূসর গোড়ালিতে ভর দিয়ে,
কোন সমুদ্র-মর্মরকে নয় জোড়া-তরঙ্গটি তাদের থেকে
বেছে নেয় শুধু ক্যানভাসের, কপাটের, হাতের, চুলোয় ফুটন্ত
কেটলির করতালি-- সবশেষে, সুমুদ্র চিলের ধাতব
টংকার। এই সমভূমিতে প্রতারণা থেকে যা হৃদয়কে বাঁচায় তা হলো
সুযোগ নেই কোথাও লুকিয়ে থাকার, আর চোখের সামনেই অফুরন্ত প্রান্তর।
ধ্বনিমাত্রই প্রতিধ্বনি চায় আর এর অভাবই আতঙ্ক ছড়ায়।
এক পলক তাকালে তা-আর না-তাকাতেই বাধ্য করে।

------

উত্তরাঞ্চল দুমড়ে দেয় ধাতু, কাচ হয়তো এ করে না বেঘাত;
কণ্ঠকে বলতে শেখায়, “দাও ভেতরে আসতে।”
জেগে ওঠেছিলাম আমি সেই ঠান্ডায়, গরম করতে হাত,
যে-ঠান্ডা জমেছিলো কলম-ধরা আঙুলগুলোতে।

ঠাণ্ডায় জমতে জমতে দেখি লাল সূর্যটা অস্ত যায়
সাগরের ওপাড়ে, আর কোন প্রাণও-যে নাই
দৃষ্টির সীমায়। আমার গোড়ালি হয় বরফে পিছলায়, না-হয় গ্রহটা নিজেই
আমার পায়ের নিচে তীক্ষ্ম ঘুরে যায়।

আর আমার গলায়, যেখানে ক্লান্তিকর এক কাহিনি
না-হয় চা, না-হয় স্বাভাবিক হয়তো হাসি থাকাই,
সশব্দে তুষার বাড়ে শুধু আর “বিদায়!”
ঢেকে যায় অন্ধকারেই, যেমন স্কট মেরুর ঝঞ্ঝায়।

------

প্রেমের অলীক ভুবন থেকে নয়, এনথ অব মার্চেম্বার থেকে, স্যার
হৃদয়-মেয়ে শ্রদ্ধেয় প্রিয়তমা কিন্তু অবশেষে
এ তো যুক্তিহীন স্মৃতি যাকে ফেরাতে পারবে না আর
তোমার নয় সে আর, আর-কারোই অনুরাগী সে নয়
যে শুধু স্বাগত জানায় তোমাকে পাঁচভাগ পৃথিবীর এই শেষভাগ থেকে
রাখাল বালকদের তিমির-মতো-পিঠে ভর দিয়ে শুয়ে থেকে
ফেরেস্তা যতো না, তার চেয়ে তোমাকে অনেক বেশি ভালবাসতাম
আর ভালবাস ঈশ্বরকেও তার নিজের চেয়ে আর সে-কারণেই
তোমার থেকে অনেক দূরে আর এখন আমি
তাদের দুজন থেকেই দূরে শেষ রাতে এই ঘুমন্ত উপত্যকায়
এই গ্রামীণ মহল্লায় ওই দরজার খিলের দিকে ছুটছি
মামুলি বেড়ার যে বাড়িটা পুরোপুরি তুষারে ছাওয়া 
আর চেঁচিয়ে ডাকছি “তোমাকেকেকে” আমার বালিশ থেকে
অনেক সমুদ্র দূরে আর তা পার হতে চেয়ে
অন্ধকারে আমার এই হাতপা ছুড়াছুড়ি তোমারই প্রতিচ্ছবি-
উন্মাদনা-আক্রান্ত এক আয়নার মতো।

------

কিছু পর্যবেক্ষণের ফর্দ একটা। ওই কোনায় গরম একপল।
দৃষ্টি তার ছাপ রেখে যায় পড়ুক-না যার উপর।
গ্লাসের সবচেয়ে পরিচিত-রূপ হলো জল।
মানুষ তার কঙ্কালের চেয়ে কত ভয়ঙ্কর।
মদ হাতে শীতসন্ধ্যা কোথাও নেই আর। কালো
বারান্দা শুধু ঠেকিয়ে চলে ওসিয়ার ঘাসের দৃঢ় আঘাতগুলো।
হিমবাহের আবর্জনা-ঢিবির মতো বিপুল হয়ে ওঠে
কুনুইয়ে ভর-রাখা দেহ, পাথর শিলার টিলার মতোই বটে।
হাজার বছর পর, তুলে ধরবে তা সন্দেহ নেই কোন
গজ কাপড়ের পর্দার আড়ালে আশ্রিত-লুকানো
এই দ্বিপত্রী বীজের ফসিলকে, আঁচলের ছাপের নিচে ওষ্ঠ-ছাপ সহ,
অস্ফুটে যে “শুভরাত্রি” জানাচ্ছে কোন দ্বি-পাট জানালাকে।

------

এই বাতাস লক্ষ্য করলাম সুস্থ করে তুলছে বেঁকে-যাওয়া ঘাসকে
নতজানু যারা বাতাসের প্রতি তাতারদের প্রতি হয়েছিলো যেমন।
মনে পড়ে এই পাতাটিকেও রাস্তার পাশে কাদায় মাখামাখি ছিলো যে
নিজের রক্তে মাখামাখি টকটকে লাল যুবরাজের মতো।
ছড়িয়ে আছে সিক্ত-তীরগুলো যারা তীর্যক ছুটে যায়
আরেক দেশের কোন গর্বোত্থিত কাঠের চালার দিকে,
এক ফোঁটা অশ্রু গালে নিয়ে হেমন্ত কথা বলে, ওড়ার সময়
বালিহাঁস যেভাবে ডাকে। আর সিলিংয়ে যখন
ঘোরাফেরা করছে আমার চোখ, ঘরের ভেতরেই জপ করছি আমি
ওই ব্যকুল লোকটার হামলার মতো তা নয়
তবে তোমার কাজাখ নামটা পুরোই উচ্চারণ করি যা এই জনগোষ্ঠীর
মনের গোপনচাবি হিসেবে এখনও আমার কণ্ঠে গুঁজে-রাখা ।

------

নাবিক-নীল এক সকাল বরফ-ছাওয়া শার্সিতে
বরফে তলানো গলির হলুদ সড়কবাতিগুলোর কথা মনে আনে,
বরফাচ্ছন্ন কানাগলি, আড়াআড়িপথ, দুইপাশ দিয়ে ছুটে যায়
ইয়োরোপের পূর্ব প্রান্তে ঠেস-দেয়া এক তাঁবুঘর।
“হানিবল...” গুণগুনায় সেখানে, একটা বেহাল মটর,
জিমের প্যারালাল বারগুলো বগলের উটকো গন্ধে ভরা;
যেহেতু তুমি ভয়ংকর ব্ল্যাকবোর্ডটা ভেদ করে দেখতে ব্যর্থ,
তাই নিখাঁদ কালো হিসেবেই পড়ে আছে তা। বিপরীত পাশটাও।
টিংটং ঘন্টিটাকে স্ফটিক বানিয়ে ছেড়েছে রূপালি তুষার। আর ঐ সব
প্যরালাল লাইনের জিনিপত্রের তুলনা করি যদি
তার সত্যি-চেহারাটা বেরিয়ে পড়েছে, হাড়ের জামাটাও, আসলেই।
জেগে ওঠতে চায় না এখন। আর চায় নি, কখনো।

------

তুমি ভুলে গেছ বিলের পর বিলের মাঝে হারিয়ে যাওয়া ঐ গ্রামটিকে
পাইন বনের এলাকায় যেখানে ফলবাগানগুলোতে কখনো
কাকতাড়ুয়া থাকে না: ফলনের তুলনায় খুব বেমানান বলে,
আর পথঘাটও বড়ো খানাখন্দে ভরা আর ভীষণ ভাঙ্গাচুরা।
বুড়ী নাসতাসিয়া মৃত নির্ঘাত, আর পেস্তারেভও মনে হয় নেই আর,
না-হয়  মদে চুর হয়ে সে পড়ে আছ