"/> অন্তর্জাল

অলাত চক্রে ঘুরে পুড়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ
আহমেদ শামীম -11/12/2016





কাত্তরের আগের পাকিস্তান আর আজকের পাকিস্তান এক নয়। ২৬ শে মার্চ যেমন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে, সেদিনই জন্ম হয়েছে আজকের এই অর্বাচীন পাকিস্তানের। ভুলে গেলে চলবে না প্রাচীন পাকিস্তানের দুইটি ভাগ দুইটি দেশে রূপ নিয়েছে। ওই দুই রূপের মধ্যেই প্রাচীন পাকিস্তানের ভুত আজো বিরাজমান। অর্থাৎ কিনা বাংলাদেশ আর অর্বাচীন পাকিস্তান একে অপর থেকে স্বাধীন ঠিকই, কিন্তু তারা প্রাচীন পাকিস্তানের ভুতের কাছে আজো পরাধীন।

এদিকে বাংলাদেশ আজো সেই প্রাচীন পাকিস্তানের আছর থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য যুদ্ধরত। অন্যদিকে আজকের ভারত '৪৭-উত্তর সেই ভারতই। '৭১-এ ভারত  বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হাতিয়ে নিয়েছিল। আহমদ ছফার অলাত চক্র উপন্যাসে অনিমেষ বাবু '৭১ নিয়ে  বলেছিলেন, "আমার অনুমানটা সত্যি হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ভারতের যুদ্ধে পরিণত হবে। বাংলাদেশ হয়ত স্বাধীনতা পাবে, কিন্তু কোন্‌ স্বাধীনতা?"

তার অনুমান সত্যি হয়েছে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বেহাত হয়েছে- ছফার মুখপাত্র দানিয়েল সে কথা আমাদের পরিষ্কার করে দেন, "আমাদের যুদ্ধটা ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।" আরও বলেন, "[...] ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধটিই কি বাঙালী জাতির বিগত বাইশ বছরের রক্তাক্ত সংগ্রামের একমাত্র ফলাফল। এই যুদ্ধে হয়ত ভারত জয়লাভ করবে এবং জাতীয় সংগ্রামের এই পরিণতি। এটাই কি আমরা চেয়েছিলাম?"

আমার প্রশ্ন, জাতীয় সংগ্রামের পরিণতি কি অন্ততপক্ষে কাগজে কলমে একটি স্বাধীন জাতি-রাষ্ট্র নয়? ১৯৮৪ সনে কি বাংলাদেশ তা ছিল না? তাহলে কেন ছফা তখন অলাত চক্র লিখছেন? তাহলে কী চেয়েছিলাম আমরা? একটি গণতান্ত্রিক বিপ্লব? আইয়ুবের বদলে এরশাদ পেয়ে ছফা কি তবে অতীত নিয়ে খেদ করছেন এইখানে- "এটাই কি আমরা চেয়েছিলাম?"   

এই বাংলা গণতন্ত্রের জন্য সেই ৪৭ সাল থেকে সংগ্রাম করে আসছে, '৫২ তে দেশের ভাষানীতির গনতন্ত্রায়নের জন্য জীবন ক্ষয় করেছে,  ৫৪ তে সাফল্য পেয়েছে প্রাদেশিক নির্বাচন জিতে, '৬৯-এ আইয়ুবের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের জন্ম দিয়েছে, ৭০-এ সারাদেশ জয় করে গণতান্ত্রিক পাকিস্তানের সম্ভাবনা জাগিয়েছে। তখন প্রাচীন পাকিস্তান তা বারবার নস্যাৎ করেছে। গুণে নয় লক্ষণে, '৯০-তে এসে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মত কিছু একটা উকি দিয়ে হারিয়ে গেছে। এখন সে গণতন্ত্র নস্যাৎ করছে কোন 'পাকিস্তান'? বাংলাদেশে গণতন্ত্র না থাকলে কোন দেশের স্বার্থ হাসিল হয় আজ?

প্রাচীন পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের মুক্তির এই বর্তমান যুদ্ধে (দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ?) ভারতের ভূমিকা কী? আজো কি প্রাচীন পাকিস্তানের ভুতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হাতিয়ে নিচ্ছে ভারত? প্রথম মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ছফার উপন্যাসে এসেছিল এমনসব লাইন- "বাংলাদেশ ভারতের নৌকায় পা রেখেছে। সুতরাং ভারত যা করে বাংলাদেশকে অম্লানবদনে মেনে নিতে হবে", আর "ভারত পাকিস্তানের যুদ্ধের কারণে যে অন্ধকার কলকাতা শহরে ছড়িয়ে পড়েছিলো, সেই অন্ধকারের মধ্যে তায়েবা (পড়ুন বাংলাদেশ) আত্মবিসর্জন করলো।" দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের পরিণতিও যদি হয় ভারতের হাতে চলে যাওয়া, তাহলে তা নিয়ে কি ছফার সন্তানেরা অমনসব লাইন আবার রচনা করবে?   

তারা কি লিখবে, কেন বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে একটি গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সম্ভাবনা বার বার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে? কম্যুনিস্ট রেভ্যুলিউশনের কথা না হয় বাদ, বাংলাদেশের ইতিহাসে তা বেশ 'কমপ্লিকেইটেড'। গ্রামসির তত্ত্বায়িত প্যাসিভ রেভ্যুলিউশনের পথ ধরেও কেন সাধের গণতন্ত্র বাস্তব রূপ নিচ্ছে না বাংলাদেশে? গনতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরনের জন্য তো বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগে দাঁড়াতে হবে। তারা কি লিখবে কারা সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর কোমর ভেঙ্গে দিচ্ছে? 

তারা নিশ্চয়ই এটা বলবে না যে, সেই প্রাচীন পাকিস্তানের ভুতই বাংলাদেশের ঘাড় মটকে দিচ্ছে বারবার?  যদি তা সত্যিও হয়, তাহলে বাংলাদেশের কাঁধে চড়ে বসা প্রাচীন পাকিস্তানের ভুতকে ভারত থেকে ধার করে আনা ঝাঁটার বাড়ি দিয়ে তাড়ানোর চেষ্টা বাদ দিতে হবে। কারণ তার ফল আমরা প্রথম মুক্তিযুদ্ধের পরিণতিতে দেখেছি। লাভ হয়নি।
বাংলাদেশের থেকে প্রাচীন পাকিস্তানের ভুতকে গণতান্ত্রিকভাবেই তাড়াতে হবে। ইতিহাসের দায় শোধ করতে হবে গণতন্ত্র বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে- যা প্রাচীন পাকিস্তানের জন্য ছিল পরীক্ষিত যম।  তা না হলে এইভাবে এই অলাত বা অগ্নি চক্রে ঘুরে ঘুরে পুড়ে পুড়ে ছাই হতে থাকবে এই দেশ। সেই ছাই থেকে জন্ম নিবে এমন এক বাংলাদেশ, যার কোন ধারণাই আমাদের কাছে নেই।