"/> অন্তর্জাল
কথা-সাহিত্য
মাহমুদুল হকঃ বিচ্ছিন্নতাবোধের স্বরূপ সন্ধানে
-11/11/2016





 

৭-এর দেশ বিভাগের সময় মাহমুদুল হক ছিলেন কিশোর । পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার বারাসাত উপজেলা থেকে ঢাকার আজিমপুরে এসে যখন সপরিবারে বসবাস শুরু করেন তখন তার বয়স মাত্র দশ । শ্রেনিকক্ষের বাধ্যবাধকতা ও রুটিন মাফিক লেখাপড়ার চাইতে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতেই বেশি পছন্দ করতেন । ফলে ইন্টারমিডিয়েটে ওঠার পর আঠারো বছর বয়সেই তিনি একাডেমিক লেখাপড়ায় ইস্তফা দেন । কিন্তু প্রবল ব্যক্তিগত আগ্রহ ও অভিসন্ধিৎসু মনের জোরে শিল্প, দর্শন, ইতিহাস, জীব বৈচিত্রের বিভিন্ন শাখায় তিনি নিজের পড়াশুনা চালিয়ে যান । যার জন্য নিজস্ব ভাষা সৃষ্টির ক্ষেত্র তৈরিতে তিনি এক অবিস্মরণীয় নাম হয়ে ওঠেন । এই রচনায় লেখক মাহমুদুল হকের শৈলী, বৈশিষ্ট্য এবং কতিপয় বৈশিষ্ট্যের পেছনের স্বরূপ সন্ধান করাই মূখ্য উদ্দেশ্য ।


মাহমুদুল হকের বাংলা সাহিত্যে আবির্ভাব ঘটে সত্তরের দশকে । ভাষা শৈলীতে নিজস্ব ভঙ্গিমার জন্য তিনি স্মরণীয় । কাব্যপনা, অপ্রচলিত শব্দের সংস্থান, গল্প গাঁথুনিতে সাবলীল ইত্যাদি তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য । সাহিত্যাঙ্গনে তিনি ‘জীবন আমার বোন’, ‘অনুর পাঠশালা’, ‘নিরাপদ তন্দ্রা’, ‘কালো বরফের মত গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস নিয়ে আসেন । ‘খেলাঘর’, ‘প্রতিদিন একটি রুমাল’ তার গুরুত্বপূর্ণ গল্পগ্রন্থ ।  তার বিভিন্ন রচনায় মুক্তিযুদ্ধ বা যুদ্ধকালিন গল্প এবং সমকালিন সামাজিক বাস্তবতা প্রাসঙ্গিক হলেও সেখানে তার অনেক চরিত্রদের উপস্থিতি যেন এক বিচ্ছিন্নতাবোধের প্রতিরূপ । উপন্যাস ‘জীবন আমার বোন’ যুদ্ধের নয়, যুদ্ধকালিন উপন্যাস । যেখানে একজন ভাই ‘খোকা’ তার বোন ‘রঞ্জু’র সাথে শহরের প্রত্যন্ত জায়গায় থাকে । যুদ্ধের মধ্যেও উদাসিন হেঁটে বেড়ায় খোকা । আজ না, কাল না করেও কোথাও আশ্রয় নিতে যায় না সে বোনকে নিয়ে । যেন এই পরিস্থিতির কিছুই সে ধরতে পারছে না, এর সাথে তার কোন সম্পৃক্ততা নেই এবং এসবেরকিছুই সে চায়নি, নিতান্তই এসে পড়েছে । এদিকে যখন শহরে ঢুকে পড়েছে মিলিটারি বাহিনী এবং সমস্ত দেশ মুহূর্মুহু আক্রমণে ভঙ্গুর প্রায়, তখন খোকার চোখে ঝরে পড়ছে অন্ধকার । ইতিপূর্বে বন্ধুদের আড্ডায় বাকপটু খোকাকে প্রচন্ড বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে দেখা যায় । কিন্তু পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যতা বিধানে অপারগ খোকা সম্যকভাবে বিচ্ছিন্ন রয়ে যায় । যেমন গল্পের মধ্যে আড্ডার এক পর্যায়ে খোকা আত্মধিক্কারের মত বলে- ‘আসলে কই জানো, আমার মেটামরফসিস হয়েছে, আমি শালা গ্রেগর স্যামসার মত বিটকেলে পোকা বনে গিয়েছি’ । এখানে আমরা দেখি কাফকার গল্পের চরিত্রের সাথে নিজেকে মিলিয়ে কিভাবে এক অসাড় অবস্থান নেন খোকা রূপী লেখক । যুদ্ধে পক্ষ-বিপক্ষ ছাড়াও অনেক অজানা অবশ অংশের মতই কেবল একজন দ্রষ্টার মতো বিঘ্নহীন উৎকন্ঠায় বয়ে চলে গল্পের চরিত্র । ক্ষণিকতা ও মুড বেইজড লজিক কথা-বার্তায় প্র্যাকটিস করে সে । খিস্তি-খেউড় ও অসহিষ্ণু আচরণ যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ব্যক্তির মধ্যে কই করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে তা মাহমুদুল হক পড়লে আরেকবার অনুধাবন করা যায় । ইন্স্যানিটির চুড়ান্ত মাত্রাকেও যেন অতিক্রম করে চরিত্ররা । যেমনঃ ‘নিরাপদ তন্দ্রা’ উপন্যাসে আমরা দেখি একজন স্বশিক্ষিত লোককে, যে কিনা শহরের কোন এক রেল লাইন নিকটস্থ বস্তিতে গিয়ে কোন নির্দিষ্ট কর্মকান্ডহীন বসবাস করে একটা খুপড়ি ঘরে । এ গল্পের মূল চরিত্র ‘হিরণ’ গ্রাম থেকে শহরে আসা ছিন্নমূল এক যুবতী নারী । তাকে অবলোকনের মধ্য দিয়ে বর্ণনাত্বক এক বাস্তবধর্মী চিত্রায়ন ঘটে এই উপন্যাসে । একটা মেয়ে ভাগ্য পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে শহরে যার সাথে আসে, তার কাছ থেকে অপ্রত্যাশিত ধোঁকা খেয়ে হাত বদলে অন্যত্র এসে পড়ে । সেখানে তাকে পণ্যের মত বিকোয় নানা মানুষ এবং আবার এক সম্পর্কের জেরে বেরিয়ে আসে অবৈধ অস্তানা থেকে । শেষ পর্যন্ত নানা টানা পোড়নের মধ্য দিয়েও নারীকে প্রেমের পুণ্যভূমি, প্রাণের আদিকেন্দ্র হিসেবেই প্রতিভূ করেন লেখক এ উপন্যাসে । এই উপন্যাসে বর্ণনাকারী বা বক্তাকে একজন নির্জন দ্রষ্টা বলে মনে হয়, যার ঘটনার সাথে সমৃক্ততা সামান্য । গল্পকারের সাথে সামাজিক বিত্ত ব্যবস্থা বা অর্থনৈতিক শ্রেনী বিন্যাসের সাথে যোগাযোগ  উপন্যাসে লেখককে নিরপেক্ষ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ দ্রষ্টা করে তোলে । ব্যক্তি জীবনের সাথে এক বিচ্ছিন্নতা বোধের জন্যই হয়ত একজন লেখকের পক্ষে নিজের সম্প্রদায়ের বাইরে নির্বিকার বর্ণনা ও বাস্তবতা অবলোকন করা সম্ভব হয় ।


জীবদ্দশায় মাহমুদুল হকের জীবন ধারণের অবলম্বন ছিল পারিবারিক অলংকার ব্যবসা । লেখনী থেকে আয়ের আশা আর দশ জনের মতই ছিল না বললেই চলে । লেখাকে তিনি সাধনার অংশ হিসেবেই বিবেচনা করতেন । সমকালে তিনি তুখোড় আড্ডাবাজ হিসেবে পরিচিত ছিলেন । ৭১-এর আগে জিন্নাহ এভেন্যুর ‘রেকস’ রেস্তরা, পরবর্তীতে ‘বিউটি বোর্ডিং’, তৎকালীন ফূলবাড়িয়া রেলস্টেশন সহ নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘তাসমেন জুয়েলার্স’ ইত্যাদি ছিল বন্ধু ও সহযাত্রীদের সাথে আড্ডা দেয়ার জায়গা । বিভিন্ন সময়ে নানান আড্ডায় তার সঙ্গী ও নিকটস্থরা ছিলেন খালেদ চৌধুরী, মীজানুর রহমান, মুহম্মদ খসরু, রফিক আজাদ, কায়েস আহমেদ, শহীদ কাদরী, আক্তারুজ্জামান ইলিয়াস সহ প্রমুখ ।

‘কালো বরফ’ উপন্যাসের নায়ক ‘আবদুল খালেক’ শৈশব স্মৃতিতে আশ্রয় নিয়ে বর্তমানের বিরূপতা থেকে পরিত্রাণ পেতে চায় যেন । উপন্যাসিকের নিজের বর্ণনায় ব্যক্তির স্বরূপ পুরোপুরি উন্মোচন করা যখন অসম্ভব হয়, তখন নানা কায়দায় ব্যক্তির আত্মকথনের আশ্রয় নিতে হয় । অতীত পুনরুক্তি বা স্মৃতি কাতরতা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি । এর মধ্য দিয়ে মানুষ এক প্রকার রোমন্থনের রসাস্বাধনের সুযোগ পান । ‘অনুর পাঠশালা’ উপন্যাসে লেখকের সে ধরণের এক কাতরতা ধরা পড়ে যা পরবর্তীতে লেখক এক সাক্ষাৎকারে মেনেও নেন । এই উপন্যাসে বিচ্ছিন্ন পিতা-মাতার সম্পর্কের মধ্যে অপ্রিতীকর পরিবেশে বেড়ে ওঠা কতিপয় শিশুর মানসিক গড়নের দিকে নজর দেন লেখক । ‘সরুদাসী’ নামের চরিত্রের সাথে শিশু ‘পোকার’র মানসিক লেনাদেনা, নিজের ভাই ‘মনিভাইজান’ এর সাথে বনিবনা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে শব্দ শৃংখলে আবদ্ধ হয় পটভূমি, যা লেখকের বিচ্ছিন্ন শৈশবকে যেন ফিরিয়ে আনে । এতদ সমস্ত স্বত্তে এই অনুভূমিকায় উপনীত হওয়া যায় যে, লেখক মাহমুদুল হক বিচ্ছিন্নতাবোধ সমগ্র জীবন বয়ে চলেন ।

কোন লেখক, যদি