"/> অন্তর্জাল
বন্ধুত্ব
হারিয়ে যাওয়া এক বন্ধু খুঁজে পাওয়ার গল্প
নুরুজ্জামান লাবু -11/16/2016





০০৪-০৫ সালের কথা। আমি তখন নয়াদিগন্তে কন্ট্রিবিউটিং করি। প্রথম আলো বন্ধুসভা করতাম। টুকটাক লেখালেখিও। মুসা ইব্রাহীম, সিমু নাসের, হিমেল চৌধুরী, হিটলার এ হালিম, মেহেদী আল মাহমুদসহ অনেকেই প্রথম আলো ছেড়ে নয়াদিগন্তে যোগদান করলেন, বিভিন্ন পাতার বিভাগীয় সম্পাদক হিসেবে। আমরা কয়েকজন অর্থাৎ আমি, সৈকত, আজিজসহ অনেকেই নিয়মিত কন্ট্রিবিউটিং করার জন্য নয়াদিগন্তে হাজির। তখন নয়াদিগন্তের জয়জয়কার। জামায়াতি মালিকানাধীন পত্রিকা হিসেবে এত হাউকাউ ছিলো না। তেমন কিছু জানতামও না।

তো পুরাদ্যমে কাজ করছি। বড় সাংবাদিক হওয়ার নেশায় বিভোর। কার্ডধারী কন্ট্রিবিউটার। ভাব নিয়ে চলি। কাজের নেশায় কখনো কখনো দিনমান চলে যায়। খাওয়া-দাওয়া ভুলে থাকি। দুপুরে রুটি-কলা খাই। সন্ধ্যায় শাহবাগ, চারুকলা আর টিএসসি ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডাবাজি করি।

সেই উত্তাল স্বপ্ন বোনার দিনে একদিন একটা মেয়ে আসলো অফিসে। রূপবতী মেয়ে। মুসা ইব্রাহীম ভাইয়ের কাছে এসেছে। মেয়েটি লেখালেখি করতে চায়। কন্ট্রিবিউটিং করবে। মুসা ভাই মেয়েটিকে আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। বললেন, মেয়েটিকে তোমাদের সাথে নাও। ওকে হেল্প কইরো। ফিচার রিপোর্টিংয়ে সহযোগিতা করো।

সেই থেকে মেয়েটির সঙ্গে পরিচয়। আমরা একসঙ্গে কাজ করি। নানা জায়গায় অ্যাসাইনমেন্টে যাই। রূপবতী হলেও মেয়েটির মনে কোন অহংকার নাই। আমাদের একটা ভালো ফ্রেন্ডশিপ হয়। আমরা তুমুল আড্ডাবাজিও করি। আমি সৈকত আর মেয়েটি একসঙ্গে অনেক আড্ডা দিয়েছি।

এক মাসের লেখালেখির সাড়ে ৭ হাজার টাকা বিল তুলে একটা মোবাইল কিনলাম। তখনো আমার মোবাইল ছিলো না। নতুন মোবাইল। নতুন নাম্বার। সেই মোবাইলে প্রথম ম্যাসেজ এলো মেয়েটির। অঞ্জন দত্তের 'একদিন বৃষ্টিতে বিকেলে...' গানের প্রথম অন্তরার লাইনগুলো।

তারপর আরো অনেকদিন একসঙ্গে আড্ডাবাজি। ততদিনে বন্ধুত্ব আরো গভীরে। নয়াদিগন্তের এক বড় ভাই তাকে পছন্দ করে, মেয়েটি শেয়ার করে আমাদের। এই নিয়া আমরা নানারকম বিদ্রুপ করি। বন্ধুরে খেপাই। এইভাবে দিন কাটতেছিলো, সুখের দিন। মেয়েটি কানাডায় পড়তে যাবে। শুনি, বেদনায় আমাদের মন ভাড়ী হয়। ভাবি যে, বন্ধু তো তাইলে হারায়ে যাবে। একদিন সত্যি সত্যি কানাডায় চলে যায়, ম্যাস কমিনউনিকেশন পড়তে। (যদিও সে আমেরিকায় গেসিলো। আমার স্মৃতিভম হইসে। তবু ফিলিংস থিকা যা লিখসি তা আর ঠিক করলাম না। আমার কাছে যাহা আমেরিকা তাহাই কানাডা। পাশাপাশি দেশ তো, নাকি?)

তারপর জীবন যেখানে যেরকম। মেয়েটি কানাডায় গিয়া ব্যস্ত হয়। হয়তো আমাদের ভুলে যায় কিংবা আমাদের কথা তারও মনে পড়ে। স্মৃতিকাতর হয়। আমরাও কিছুদিন তার অনুপস্থিতি তীব্রভাবে ফিল করি। তারপর আবার আগের মতো হয়ে যাই।

নাগরিক ব্যস্ততা। সংগ্রাম। স্ট্রাগল। ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্নে বিভোর। প্রেম। বিচ্ছেদ।
পাগলামি। বিয়ে। নানারকম বিষয়ের মধ্য দিয়ে আমাদের দিন পার হইতে থাকে। দিনে দিনে অবশ্য আমাদের উন্নতি হয়। মাঝে মধ্যে মেয়েটির কথা আমাদের মনে হয়। বিশেষ করে আমি সৈকত বা আজিজ একসঙ্গে হইলে বা আমি সৈকত বা আমি আজিজ আড্ডা দিলে মেয়েটির প্রসঙ্গ আসে। আমরা আবার পুরানা স্মৃতি হাতড়ায়ে বেড়াই। আর মেয়েটারে, আমাদের বন্ধুরে নানারকম দোষারোপ করি। বলি যে কানাডার মতো উন্নত দেশে গিয়া, নিজে প্রতিষ্ঠিত হইয়্যা আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের এমন বন্ধুরে মনে রাখা তার পক্ষে সত্যিই কঠিন। আমরা মনে মনে তা মেনে নেই। প্রসঙ্গ চেইঞ্জ কইরা অন্য আলাপ করি।

মেয়েটা মানে আমাদের সেই বন্ধুর কোনও ইমেইল এড্রেস নাই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তারে পাওয়া যায় না। তবু মাঝে মধ্যে ফেসবুকে তারে খুঁজি। হাতে কাজ নাই বা অফিসের চেয়ারে অবহেলায় বইসা আছি, মন ভালো নাই, আমাদের সেই বন্ধুর নাম দিয়া সার্চ দিই। অনেক নাম আসে। অনুমান কইরা প্রোফাইলে যাই। নাহ, অন্য মেয়ে। কিংবা কোনওটাতে ছবি নাই। ব্যর্থ হয়ে আবার কাজে মনোযোগ দেই।

এইরকম একদিন তারে খুঁজতে গিয়া একটা মেয়েরে আমি একটা ম্যাসেজ করছিলাম। তাও বছর খানেক আগে হবে হয়তো। প্রোফাইলে কোনও ছবি নাই। ঢাকার কথা বা বর্তমানে কানাডায়, এইরকম কিছু লেখাও ছিলো না। তবু মন বলছিলো হইতে পারে। ম্যাসেজ দিলাম, 'তুমি কি সেই এ্যানি, যারে আমি চিনি'। আর কিছু লিখছিলাম কিনা মনে নাই। সেই মেসেজ ডিলিট হইয়া গেছে। কোনও উত্তর আসে নাই। ভাবছি তাইলে সে না। অন্য কেউ হবে হয়তো।

তারপর গত শনিবার একটা মেসেজ আসে। আমার ইনবক্সে। ইদানীং বিশেষ একটা কাজ নিয়া ব্যস্ত। ফেসবুকে সময় দিতে পারি না। ফলে শনিবারের মেসেজটি আমি পরদিন রবিবার দেখি। সেখানে লেখা-
'আরেএএএএএএএ....... আমি সেই এ্যানী!!!
আশ্চর্য!!!
সৈকত ভাই কই?!!
আমি ভুইল্যা যাই নাইইইইইই......আপনারে আমিও অনেক খুঁজছি!!'

আমি বলি সত্যি নাকি। একটু দ্বিধা আমার মধ্যে। প্রোফাইলে ছবি নাই। অবশ্য দেখলে চিনতে পারুম কিনা তারও নিশ্চয়তা নাই। ১১ বছর তো কম সময় না। এর মধ্যে আমার চুল পেকেছে অর্ধেকেরও বেশি। যাপিত জীবনের নানারকম সংগ্রামে হারজিত নিয়া জীবন কাটাইতেছি। স্মৃতি লোপ পাইছে। বিপি হাই হইসে। রক্তে সুগার। কোলেস্টোরেল বেশি। মানে বয়স হইতেছে আরকি।

 এ্যানি বলে আরে 'আমারে চিনতে পারতেছেন না। আমি সত্যিই সেই এ্যানি।' তারপর কথা হয়। চ্যাটবক্স। তুমুল আড্ডা। নানারকম স্মৃতিচারণ। তার প্রোফাইল আমি ঘাইটা দেখি। এর মধ্যে আরেকটা সচল এফবি আইডিতে আমারে অ্যাড করে। অনেকক্ষণ কথা বলি। নানা প্রসঙ্গ। স্মৃতিচারণ। সৈকত, আজিজ, ওরে বিয়ার প্রস্তাব দেয়া সেই বড় ভাইয়ের কথা। আরো নানা প্রসঙ্গ। এ্যানি আমারে ওর দুইটা ছবি ইনবক্স করে। আমি কিন্তু সত্যি দেখে ওরে চিনতে পারি নাই। ওর চেহেরাটা ব্ল্যাকআউট হয়ে গেছে, আমার মাথা থিকা। কিন্তু বন্ধুত্বটা আছে।

এ্যানি জানাইলো ও এখন ফার্মাসিস্ট। বিয়া করছে। মাস খানেক আগে ঢাকায় আসছিলো। কানাডায় থাকে, টরেন্টোতে। এইভাবে ভুইলা গ্যালা কেমনে জিগাই এ্যানিরে। এ্যানি বলে, ভুলি নাই। তোমাদের অনেক খুঁজছি পাই নাই। আমিও তো কানাডায় প্রথম প্রথম স্ট্রাগল করছি। ফলে অনেক ব্যস্ত সময় পার করতে হইছে আমার। আমি বিশ্বাস করি। হইতেই পারে। দূরদেশে স্ট্রাগল না কইরা ব্যস্ত না হইয়া তো উপায় নাই।

এ্যানির প্রোফাইল ঘাটলাম। দেখি ও ছবি আঁকে। নিজের আঁকা অনেক ছবি ওর ফেসবুক ওয়ালে। অসংখ্য কবিতা। আমি রীতিমতো মুগ্ধ এবং বিস্মিত। এ্যানিরে জিগাই ক্যামনে কি? ও বলে আমি তো এমনি এমনি আঁকি আর লিখি। আমি ভাবি এইটা ক্যামনে সম্ভব। একটু ঈর্ষাও হয়। আমি নিজেই তো এত সুন্দর করে লিখতে পারি না। আঁকা তো আরো দুরের কথা।

আমার গর্ব হয়। এ্যানিনা তাহিন, আমাদের বন্ধু। ভালো ছবি আঁকে। ভালো কবিতা লেখে। কানাডায় প্রতিষ্ঠিত। ১১ বছর পর একজন ভালো বন্ধুরে ফিরে পাইছি। এইটা আমার কাছে অনেক বড় একটা ব্যাপার। আমি বন্ধুত্বরে খুব গুরুত্ব দেই। বন্ধু বন্ধুই। এ্যানি তুমি ভালো থাইকো। এই প্রার্থনা করি। আরো অনেক বড় হও। কিন্তু বন্ধুদের ভুইলা যাইয়ো না। দেশে আসলে নিশ্চয় আমরা একদিন ভরসন্ধ্যায় তুমুল আড্ডা দিবো। ফিরে যাবো পুরানো সেই দিনের কাছাকাছি। সেই অপেক্ষায় রইলাম।

সৈকত বিষয়টা এখনো জানে না। ও গাইবান্ধায়। সাঁওতাল ইস্যু কাভার করতেছে। ফেসবুকের এই পোস্ট দেখে নিশ্চিত ফোন দিবে। পুরা কাহিনী পড়ার পর নিশ্চিত আবার জিজ্ঞাসা করবে, এ্যানিরে ক্যামনে খুঁইজা পাইলা বন্ধু?

 



নুরুজ্জামান লাবু
জন্ম: ১ অক্টোবর, ১৯৮১
লেখক, সাংবাদিক
সিনিয়র প্রতিবেদক,