"/> অন্তর্জাল
আমেরিকা
যুক্তরাষ্ট্রে ঐতিহাসিকভাবে স্বামীর দায় বহন করতে হয় নারীকে
-11/11/2016





 

মেরিকার আসন্ন নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে লড়ছেন হিলারি ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। নির্বাচনে জয় লাভ করলে হিলারি হবেন আমেরিকার প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট। ডেমোক্রেটদের হয়ে লড়া হিলারির আরেক পরিচয় তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের স্ত্রী। 

আপাতদৃষ্টিতে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার উত্তরসূরি হিসেবে হিলারি বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন বলে মনে হলেও বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। নির্বাচনী মাঠের চিত্র বলছে ক্ষমতাসীনদের উত্তরসুরি হওয়ার ফলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে হিলারির নির্বাচনী প্রচারণায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

অন্যদিকে, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্বামী বিল ক্লিনটনের কৃতকর্মের জন্যও বারবার নানা অভিযোগে জর্জরিত হচ্ছেন হিলারি। প্রথম প্রেসিডেন্সিয়াল ডিবেটে ট্রাম্প এনএএফটিএ বাণিজ্য চুক্তির পক্ষে হিলারির নীরব সমর্থনের অভিযোগ আনেন যার প্রবক্তা ছিলেন বিল। এমনকি বিলের নাস্তিকতাবাদী মনোভাবের দায়ও চাপানো হচ্ছে হিলারির উপর। সমালোচকরা যেন ভুলে যাচ্ছেন বিল ও হিলারি কোন একক ব্যাক্তি নয় বরং সম্পূর্ণ আলাদা সত্ত্বা বিশিষ্ট দুজন মানুষ।

তবে হিলারির সাথে যা ঘটছে আমেরিকার ইতিহাসে তা নতুন নয়। স্বামীর মতাদর্শ গ্রহণ ও তার যাবতীয় অপারগতার ভার স্ত্রীর কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার মনোভাব প্রচলিত আছে আমেরিকান সমাজে । ঔপনিবেশিক সময় থেকে গোঁড়া আমেরিকান সমাজের অলিখিত নিয়মগুলো সংবিধিবদ্ধভাবে নারীকে শাসন করে এসেছে; যেখানে কি না স্ত্রী হিসেবে একজন নারীকে তার সম্পূর্ণ সত্ত্বা স্বামীর কাছে বিসর্জন দিতে হতো । ২০১৬ তে এসেও সে চিত্রের তেমন পরিবর্তন ঘটেনি। বিল ও হিলারিকে নিয়ে চলমান বিড়ম্বনা তারই প্রমান দিচ্ছে। এর কারণ ভালোভাবে বুঝতে হলে পৃষ্ঠা উল্টে আমাদের চলে যেতে হবে কিছুটা পেছনের দিকে।

স্ত্রীরা স্বামীর অধঃস্তন কিংবা অর্ধাঙ্গী মাত্র এ ধারণাটির সূত্রপাত কোথায়? অন্যসব মৌলিক সামাজিক ধারণার মত এ ধারণাটিও এসেছে বাইবেল থেকে। শতাব্দী ধরে আদমের সেই উক্তি-
"স্ত্রী জাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে আমার হাড় দিয়ে।"

পবিত্র বানী হিসেবে পাশ্চাত্যের সমাজ ও তার বিবাহ আইন আদমের এই উক্তি অনুসরণ করে আসছে  । ঐতিহ্যবাহী বিবাহগুলোতে এখনো ধর্মোপদেশ হিসেবে আদমের এ উক্তি উচ্চারিত হয়। আমেরিকান সমাজে আশা করা হয় যে একজন বিবাহিত নারী নিজস্ব মতামত, স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক অধিকার সবকিছু স্বামীর কাছে বিসর্জন দিয়ে শুধু মাত্র একজন ”বিবাহিত নারী” হয়ে উঠবেন।

তবে সময়ের সাথে সাথে আমেরিকান আইন নারীর প্রতি শিথীল হতে শুরু করে। ১৯৪৮ সালে নারীরা সম্পত্তি অধিগ্রহণ, ভাড়া গ্রহণ ও স্বামীর ঋণের দায়ভার পরিহারের অধিকার পায়। ১৯৬০ সালে আমেরিকান স্ত্রীরা স্বামীর অনুমোদন ছাড়াই ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের সুযোগ পেতে শুরু করে। কিন্তু  একবিংশ শতাব্দীতে এসে দেখা যাচ্ছে আইনের ভাষায় নানা পরিবর্তন আসলেও স্ত্রী স্বামীর অধঃস্তন থাকবে এ ধারনাটি বেশ দাপটের সাথেই আমেরিকার জনজীবন ও ব্যাক্তি জীবনে রয়ে গেছে।

অনেক দিনের লালিত এ মানসিকতা ছড়িয়ে পড়েছে প্রগতিশীল রাজনীতির আনাচে কানাচেও বেশ টিকে আছে । গত কয়েক বছরের নির্বাচনের চাল-চিত্র তারই প্রমান দিচ্ছে।

২০০৪ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় দ্যা নিউ ইয়র্ক টাইমস ও নিউ ইয়র্কার পত্রিকা দুটি  মত প্রকাশ করে যে রিপাবলিকানদের পক্ষে অবস্থান ও স্পষ্টভাষী স্বভাবের জন্য তেরেসা হেঞ্জ কেরি তার স্বামীর জয়ের পথে বাঁধা হয়ে উঠতে পারেন। পরবর্তীতে দেখা যায় আমেরিকার জনগন ঠিক সে হিসেবই মিলিয়েছে।

হেঞ্জ কেরি কে এককভাবে মূল্যায়ন না করে বরং তেরেসার আচরণ বিশ্লেষণ করে সার্বিকভাবে জনগন তাদের রায় দিয়েছিল। অর্থাৎ প্রার্থী একজন হলেও একাধিক নিয়ামক দ্বারা প্রভাবিত হয়েই নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারিত হচ্ছে।

ঠিক একই চিত্র দেখা যাচ্ছে এ নির্বাচনে। রাজনৈতিক বক্তারা অনবরত বিলের নানা নীতি ও কাজের জন্য আঙ্গুল তুলছেন হিলারির দিকে। হিলারির দিকে ছুড়ে দেওয়া অভিযোগের মধ্যে আছে- এনএএফটিএ, ১৯৯৬ এর ওয়েলফেয়ার রিফর্ম ও ১৯৯৪ এর ক্রাইম বিল যার সবই স্বামী বিলের শাসনামলের ঘটনা। এ সময় গুলোতে ফার্স্ট লেডি হিসেবে হিলারি তার স্বামীকে সমর্থন করে গেলেও সম্প্রতি নিজের নির্বাচনী প্রচারনায় এগুলোর বিপক্ষে মুখ খুলছেন তিনি। হতে পারে এটি রাজনৈতিক চাল আবার হতে পারে এটি তার ব্যাক্তিগত রাজনৈতিক দ্বন্দকেই তুলে ধরছে।

বিলের ক্ষমতার প্রথম মেয়াদে স্বাস্থ্যনীতি সমর্থনসহ নানা কারণে হিলারির জনপ্রিয়তা কমতে থাকে যার ফলশ্রুতিতে বিলের শাসনের দ্বিতীয় মেয়াদে অনেকটা জোর করেই মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয় হিলারিকে। কিন্তু পরবর্তীতে মনিকা লিউন্সকি কেলেঙ্কারীতে হিলারিকে স্বামীর পাশে দেখা গেলে আবারও বাড়তে শুরু করে হিলারির গ্রহনযোগ্যতা । সুতরাং দেখা যাচ্ছে আমেরিকানদের চোখে এখনো হিলারির ব্যাক্তিসত্ত্বার তুলনায় স্ত্রী সত্ত্বাই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

তাই ৮ নভেম্বরের নির্বাচনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করা স্বামী বিলের প্রভাবে হিলারির পতন ঘটবে নাকি বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর পদটির দিকে হিলারি এগিয়ে যাবে সে প্রশ্ন থেকেই যায় ।

ফিউসনে প্রকাশিত লিজ লেঞ্জ এর লেখাটি অন্তর্জালের জন্য অনুবাদ করেছেন ফাতিমা সারওয়ার।



 

ফিউশন অবলম্বনে