"/> অন্তর্জাল
ঢাকা লিট ফেস্ট
ভি.এস. নাইপলের সঙ্গে কথোপকথন
বাংলা ট্রিবিউন -11/20/2016





 ঢাকা লিট ফেস্ট ২০১৬-এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব ‘ভি. এস. নাইপলের সাথে কথোপকথন’- পর্ব অনুষ্ঠিত হয় শুক্রবার (১৮ নভেম্বর)। উপস্থাপক আহসান আকবর স্যার ভিদিয়ার সাহিত্যিক জীবনের বিভিন্ন গল্প তুলে এনেছেন। কথোপকথনে আহসান আকবরের প্রশ্নের জবাবে নাইপল ছোট ছোট মন্তব্যে নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন তথ্য জানিয়েছেন। কথোপকথনটি বাংলা ট্রিবিউন থেকে অন্তর্জালের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

 

আহসান আকবর :
স্যার ভিদিয়া শুধু একজন নোবেল বিজয়ী লেখকই নন তিনি সেই গুটিকয়েক সাহসী লেখকদের একজন যিনি বাংলাদেশে আসতে ভয় পাননি। যার লেখক হয়ে ওঠার পেছনে একটা বড় কাহিনী আছে। তবে আমার মুখে নয় আমরা সেগুলো শুনব তার মুখেই। আমাদের সঙ্গে আছেন স্যার ভিদিয়া এবং তার স্ত্রী নাদিরা নাইপল। আমরা এখন তার সঙ্গে কথা বলবো। স্যার ভিদিয়া আপনার প্রথম বইয়ের নেপথ্যে থাকা ঘটনার কথা যদি বলতেন...

নাইপল: আসলে প্রথমে আমার লেখার মতো তেমন কিছুই ছিল না। আমি লেখক হতে চেয়েছিলাম কিন্তু যখন লিখতে গেলাম তখন লেখার মতো কিছুই খুঁজে পেলাম না। আমার মনে হয় সবার ক্ষেত্রেই এমনটি ঘটে। তবে আমাকে উদ্বিগ্নতা ভুলে যাওয়ার জন্য লিখতে হয়েছিল, যা ছিল আমার জন্য একটা বিশাল পরীক্ষা। এটা বেশ অদ্ভুত ঘটনা আর আমার সবকিছুইতেই ছিল উদ্বিগ্নতা।

আ.আ: আপনার প্রথমদিকের বইগুলো ছিল বেশ হাস্যরস ও কৌতূহলে ভরপুর। তারপর আপনি আপনার লেখার আসল পরিণত অবস্থায় আসলেন তখনও আপনার উদ্বিগ্নতা ছিল চোখে পড়ার মতো। হুট করে এভাবে এই পরিবর্তনটি কিভাবে সম্ভব হলো?

নাইপল: পুরো ব্যাপারটাই গোলমেলে। এ সময়টা ছিল বিশৃঙ্খলায় ভরপুর। আমরা তো অনেক কিছুই নষ্ট করে ফেলি- সময় নষ্ট করি, কাউকে মেরে ফেলি, অনেক চেষ্টার পর যাদুর মতো করে যেন সেই বইগুলো লেখা হয়ে গেলো।

আ.আ: চারটি উপন্যাসের পর আপনি হুট করে নন ফিকশান লিখে ফেললেন। এটা কিভাবে সম্ভব হলো?

নাইপল: এটা লিখতে গিয়ে আমাকে অনেক ঝামেলা পেরোতে হয়েছে। তবে এখন আমি যদি আপনাকে এটা বলতে পারতাম আমি আরও একটি উপন্যাস লিখে ফেলতে পারতাম (হাসি)...

(এ সময় নাদিরা নাইপল তার হয়ে কথা বলেন)

নাদিরা: ভিদিয়া খুবই এলোমেলো ছিল।  সেই ঘটনাটা আপনাদের শোনাই- হয়েছে কী, একবার রান্নার ঘরে টেবিলের ওপর ‘অ্যা হাউস ফর মি. বিশ্বাস’ -এর পাণ্ডুলিপি রেখে ভেনিসে একটা সস্তা ভ্রমণে তিনি বেরিয়ে গিয়েছিলেন। তাইলে বুঝুন যদি পাণ্ডুলিপিটি পুড়ে যেতো তাহলে কি হতে পারত! সেটা ত তখন সংরক্ষণের তেমন কোনও ব্যবস্থা ছিলো না।

নাইপল: এখন খুবই মজার হলেও তখন ব্যাপারটা এমন হালকা ছিল না। জীবনের সবকিছুই সাজানোভাবে ঘটে না। এটা আসলেই এক দারুণ লেজেগোবরে পরিস্থিতি। পেছন ফিরে তাকালে আমার মনে হয় আমি কত খারাপ লিখতাম। কারণ আমার প্রথম লেখাটি নিয়ে প্রকাশকের কাছে গেলে তিনি আমাকে সেটা ফেলে দিতে বলেছিলেন। যে কারণে আমি বেশ আহত হয়েছিলাম।

আ.আ: সারাজীবন আপনি একটু স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে পৃথিবীকে বুঝার চেষ্টা করেছেন। বিশেষ করে ‘এ বেন্ট অন দ্য রিভার’ বইয়ে সেই পরিচয় মেলে। এই সম্পর্কে কিছু বলুন।

(এ সময় নাইপলের হয়ে তার স্ত্রী নাদিরা নাইপল বলেন)

নাদিরা: সবাই বলেন এটা আসলে একটি প্রফেটিক বই।

নাইপল: এমন হতে পারে কোন এক সমালোচক আমার পাণ্ডুলিপিগুলো খুঁজে পাবেন এবং দেখতে পারবেন বুঝতে পরবেন যে, এই লেখার পুরো বিষয়টি কতখানি জটিল।

আ.আ: দেখা যেত সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় আপনার সঙ্গে দুটি নোটবুক থাকত। একটি বুকপকেটে আরেকটি আপনার শার্টের সাইড পকেটে। এই ব্যাপারে কিছু বলুন?

নাইপল: ব্যাপারটা যত সহজ করে দেখছেন সেটা কিন্তু এত বেশি সহজ নয়। এগুলো সব খুব জটিলটায় ভরপুর। চাইলেই এগুলো বুঝা যাবে না।

আ.আ: জানতে চাই আপনার ওই চরিত্রগুলো পেলেন কোথায়, যাদের সাক্ষাৎকার আপনি নিয়েছেন।

নাইপল: আমি আপনাকে একটা ধারনা দিচ্ছি- যখন আমি শুরু করলাম, আমার কী হলো... একটা যাদুর মতো করে পুরো বিষয়টা আসলো... আসলে পুরো ব্যাপারটাই দেখবার ভঙ্গি নিয়ে। পেছন ফিরে তাকালে নিজেকে অনেক বেশি ভাগ্যবান মনে হয়।

আ.আ: আমরাও নিজেদের ভাগ্যবান মনে করছি আপনার এতগুলো বই পেয়ে। আপনি কী এবার আপনার আফ্রিকার ওপরে লেখা বইগুলো নিয়ে কিছু বলবেন? ‘এ বেন্ড অন দ্য রিভার’ উত্তর-উপনিবেশ নিয়ে আমাদের দেখার ভঙ্গিটাই পাল্টে দিল।

নাইপল: প্রথমদিকে আমি কোথাও যাচ্ছিলাম… কোথায় যেন… আমি নিশ্চিত নই…

আ.আ: ৪৫ বছর বয়েসের মধ্যেই আপনি পনেরটি বই লিখে ফেললেন। আর এই সময়ের মধ্যেই পৃথিবীর সব বড় বড় সাহিত্য পুরস্কার আপনার ঝুলিতে এসে গেছে। তবু আপনি কেন সবসময় এত উদ্বিগ্ন বোধ করেন?

নাইপল: (নিশ্চুপ)

আ.আ: এবার আমি একটু নাদিরার কাছে জানতে চাই, সহজেই কেন বাংলাদেশে আসতে আপনারা রাজি হয়ে গেলেন?

নাদিরা: আমার ভেতরকার একটুখানি বাংলা আমাকে এখানে টেনে এনেছে। আমার কিশোরী বয়সে এখানে একটা দারুণ সময় কেটেছে। কিছু বন্ধন আছে যা চাইলেই ভুলে যাওয়া যায় না। আমি বাংলাদেশকে ভুলতে পারিনি। সেই ভালবাসা থেকেই সহজেই আসতে রাজি হয়ে গেলাম। এছাড়া ভু-রাজনৈতিক পরিবর্তনই সবকিছুকে পাল্টাতে পারে না। যে কারণে আমি ভিদিয়াকে বাংলাদেশে আসার ব্যাপারে জোর দিয়ে বললাম।

(নাইপলের দিকে তাকিয়ে)

-তোমার কি মনে পড়ে আমাদের অগাস্টাস নামে একটি বিড়াল ছিল আর তুমি সবকিছুই ভুলতে পারতে কিন্তু তাকে তুমি এখন ভুলতে পার না। নাইপল সবসময় বলতেন যে, তিনটি জীবন দরকার একটি কাজের জন্য, একটি অভিজ্ঞতার জন্য, আরেকটি ভালবাসার জন্য। আর এই ভালবাসার জন্যই তাকে বিড়ালটি উপহার দিয়েছিলাম যেটা তিনি পকেটে নিয়ে ঘুরতেন। আর এই নামটা এজন্যই রাখা যে, তিনি সবসময় বলতেন- আমার বাড়িটা যেন আর প্রজাতান্ত্রিক না হয়ে যায়।

প্রথম প্রশ্নকারী: আপনি লেখাকে বলেছেন যন্ত্রণাদায়ক, ভয়ংকর। এখনও আপনাকে কেন ব্যাপারটা প্রেরণা দেয়?

নাদিরা: সবকিছু সত্ত্বেও তুমি কীভাবে চালিয়ে যাচ্ছো?

নাইপল: এটা ছাড়া তো আমার আর কিছু করার নাই।

২য় প্রশ্নকর্তা: এখন আপনি কিসে ভাল থাকেন?

নাইপল: আমাকে ভাবতে হবে।

নাদিরা: আমাদেরও ভাবতে হবে।