"/> অন্তর্জাল
রোহিঙ্গা শরণার্থী
ধর্ম-বর্ণ নয়, বিবেচ্য বিষয় আশ্রয় প্রাথী নিপীড়িত কি-না
কল্লোল মুস্তফা -11/20/2016





মায়ানমারের নিপীড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশে আশ্রয় না দেয়ার পক্ষে নানা ধরনের ‘যুক্তি’ দেয়া হয়। যেমন:

# বলা হয়, রোহিঙ্গারা অপরাধ প্রবণ, তারা চুরি, ছিনতাই, মাদক ব্যাবসা সহ নানান অসামাজিক কার্যকলাপে যুক্ত হয়ে পড়ে, তাই তাদেরকে আশ্রয় দেয়া যাবে না।
-বেশ ইন্টারেস্টিং একটি অযুহাত। যে অযুহাতে রোহিঙ্গাদেরকে বাংলাদেশে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না, সেই অযুহাতে তো দেশের অনেককেই লাথি দিয়ে দেশ থেকে বের করে দেয়া দরকার কারণ এরা একদিকে নিজেরা রোহিঙ্গাদের চেয়ে অনেক বড় বড় চুরি, লুটপাট ডাকাতি করছে অন্যদিকে রোহিঙ্গা সহ দেশের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ যেন বিভিন্ন ধরণের অপরাধ করে/করতেপারে/বাধ্য হয় দেশের মধ্যে তার পরিস্থিতি তৈরী করে রেখেছে। অপরাধে যুক্ত হওয়ার সাথে মানুষের দারিদ্র-নিপীড়ন-নিরাপত্তাহীনতা-অনিশ্চয়তা ইত্যাদির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। দীর্ঘদিন দারিদ্র ও নিপীড়নের মধ্যে থাকলে স্রেফ টিকে থাকার জন্যই অনেক সময় মানুষকে অপরাধমূলক কর্মকান্ডে নিয়োজিত থাকতে হতে পারে। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে আবার তা থেকে আবার বেরিয়েও আসে মানুষ। মায়ানমার কিংবা বাংলাদেশে যে বাস্তবতার মধ্যে রোহিঙ্গাদের থাকতে হয়- তা অপারাধের পক্ষে অনুকুল না হলে বাঙালি/রোহিঙ্গা কেউই অপরাধ করতো না, করতে পারতোও না। আর এই অপরাধের দোষটা বাংলাদেশের আর দশটা মানুষের যেমন, রোহিঙ্গাদেরও তেমন- এর জন্য রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আলাদা করে “অপরাধপ্রবণ” ট্যাগ দেয়া রেসিজম।

# বলা হয়, রোহিঙ্গারা জঙ্গিবাদি রাজনীতির ঘুটি হিসেবে ব্যাবহৃত হয়।
- ঘুটি হিসেবে শুধু রোহিঙ্গা না, বাঙালি বা যেকেউই ব্যাবহৃত হতে পারে - যদি ব্যাবহারকারী শক্তি আর ব্যাবহারের পরিবেশ/বাস্তবতা/পৃষ্ঠপোষকতা থাকে। যে সমস্যা বাংলাদেশের নিজস্ব রাজনীতির ও শাসকগোষ্ঠীর- তার দায় বাহির থেকে আসা জনগোষ্ঠীর উপর চাপিয়ে দেয়ার কোন যুক্তি নেই, চাপিয়ে দিয়ে এই সমস্যা থেকে মুক্তিও নেই। বরং আশ্রয় শিবির তৈরী করে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা না হলে, জীবনের তাগিদে অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের জঙ্গিবাদি শক্তির ঘুটি হিসেবে ব্যবহারের ঝুকি আরো বাড়বে।

# বলা হয়, রোহিঙ্গারা আসলে বাংলাদেশের সীমিত সম্পদে টান পড়বে, জনগণের ভাগে কম পড়বে!
-বাংলাদেশের সম্পদ সীমিত সন্দেহ নাই। কিন্তু সেই সীমিত সম্পদের সমান ভাগ কি জনগণ পায়? রোহিঙ্গারা আসুক না আসুক জনগণের ভাগে এমনিতেই কম পড়ছে। এই কম পড়া নিয়ে তো এমন ভাবে অনেককে কথা বলতে শুনি না যতটি শুনি রোহিঙ্গা ইস্যুতে। দু:খজনক বিষয় হলো, যারা এই ভাগে কম পড়ার জন্য দায়ী তারাই এখন জনগণের ভাগে টান পড়ার অযুহাতে একটি নিপীড়িত জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। আরো এক লক্ষ রোহিঙ্গার পেছনে সারা বছর ধরে যে খরচ হবে, তার চেয়ে কয়েক লক্ষ-গুণ বেশি অর্থ প্রতিনিয়ত জনগণের ভাগ থেকে লুট করে নিচ্ছে ক্ষমতাবান শাসকেরা, সেই লুট বন্ধ না করে অর্থ-সম্পদ না থাকার যুক্তি দেখিয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া বন্ধ করার কোন যুক্তি নেই।


# বলা হয়, রোহিঙ্গা সমস্যাটি মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা, এর মধ্যে বাংলাদেশের নাক গলানো উচিত হবে না।
-মায়ানমারের ক্ষমতাসীন শাসক গোষ্ঠীর নিপীড়নে যখন সে দেশের একটি জনগোষ্ঠী বিপর্যস্ত, যখন পাশে কাউকে পাচ্ছে না, যখন নিরুপায় হয়ে পাশ্ববর্তী দেশে প্রবেশ করে/করতে চায় তখন সেটি আর অভ্যন্তরীণ সমস্যা থাকেনা। এইটা প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশেরও সমস্যা। সেই সাথে এটা আন্তর্জাতিক সমস্যাও বটে। কিন্তু তার মানে এই না যে বাংলাদেশ সামরিক বাহিনী পাঠিয়ে এই সমস্যা মোকাবেলা করবে। প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশের দ্বায়িত্ব হলো দ্বিপাক্ষিক , বহুপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামের মাধ্যমে মায়ানমারের উপর চাপ প্রয়োগ করা যেন মায়ানমারের শাসক গোষ্ঠী নিজের দেশের জনগণের উপর নিপীড়ন চালানো বন্ধ করে, যেন এমন কোন কিছু না করে যা প্রতিবেশী দেশের মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাড়ায়। বাংলাদেশ এইটা বললেই যে মায়ানমারের শাসক গোষ্ঠী শুনবে তা না, তা শোনানোর জন্য ব্যাবসা বাণিজ্য, যোগাযোগ, কুটনৈতিক সম্পর্ক ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োজনে সম্পর্ক বিনষ্ট করার হুমকী দিয়ে হলেও মায়ানমারকে বাধ্য করা যায়। তাছাড়া বাংলাদেশ জাতি সংঘের শান্তিরক্ষী মিশনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। জাতিসংঘের মাধ্যমেও মায়ানমারের উপর চাপ প্রয়োগ করা দরকার বাংলাদেশের। কিন্তু বাংলাদেশের শাসক গোষ্ঠী মায়ানমারের নিপীড়ক শাসক গোষ্ঠী এবং দ্বায়িত্বহীন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে কোন দেন দরবার বা চাপ প্রয়োগের মধ্যে না গিয়ে উল্টো বীরত্ব ফলাচ্ছে অসহায় একটি জনগোষ্ঠীকে পুশব্যাক করে।

বস্তুত নিপীড়ন যখন চলে, যখন একটি জনগোষ্ঠী অপর কোন জনগোষ্ঠীর দ্বারা নিপীড়িত হয়, যখন রাষ্ট্র সেই নিপীড়ন থামানোর বদলে উল্টো মদদ দেয়, এবং ফলে যখন পাশ্ববর্তী দেশে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না তখন পাশ্ববর্তী দেশটির শাসক ও নাগরিকদের দ্বায়িত্ব তাদের আশ্রয় দেয়া। কোন ধর্ম-বর্ণ এখানে বিবেচ্য বিষয় নয়, বিবেচ্য বিষয় আশ্রয় প্রাথী জনগোষ্ঠীটি নিপীড়িত কি-না। আশ্রয় দিব কি দিব না- এটা নিয়ে ভাবাভাবির কোন সুযোগ নাই, ভাবতে হবে আশ্রয় কিভাবে দিব, কতদিনের জন্য দিব, কিভাবে তাদের প্রত্যাবসন করবো, কিভাবে নিপীড়ক দেশটির শাসক গোষ্ঠীর উপর চাপ প্রয়োগ করবো, কিভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে যুক্ত করে আশ্রয় প্রার্থীদের সেবা করব, কিভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উপর চাপ প্রয়োগ করবো যেন যত দ্রুত সম্ভব শরনার্থীদেরকে তাদের নিজ বাসভূমের অধিকার ফিরিয়ে দেব।

দেশের সীমানার ভেতরের নিপীড়িত প্রতিবেশীদের পাশে দাড়ানো যদি মানব সমাজের দ্বায়িত্বের মধ্যে পড়ে, তাহলে নিপীড়িত ব্যাক্তি স্রেফ দেশের সীমানার বাইরের মানুষ বলেই সেই দ্বায়িত্ব হাওয়া হয়ে যায় না। অবশ্য বৃহত্তর মানব সমাজের অংশ হিসেবে যদি নিজেদেরকে অস্বীকার করি- তাহলে অবশ্য অন্য কথা।




কল্লোল মুস্তফা