"/> অন্তর্জাল
সিনেমা
আয়নাবাজি: যা হইছে চলবে, খরচ উঠে আসবে
-11/11/2016





 দুই ঘণ্টার সিনেমা দেখে হল থেকে বের হয়ে লোকে প্রথমে কী করে? টয়লেটে যায়।

আমরাও খুঁজতে খুঁজতে টয়লেটে গেলাম।
হিসু করতে করতে রাফি ভাই জিগায়,
তোর কী মনে হয়?
আমার তো মনে হয় চলবে।
রাফি ভাই কয়, আমি চাই সিনেমাটা চলুক। আমরা খুব সাপোর্ট করছি সিনেমাটাকে।
আমি বললাম, কভারেজ তো আমরাও দিচ্ছি। সাপোর্টও করছি খুব।
রাফি ভাই বলে, গল্পটা কিন্তু বলতে পেরেছে।
গল্পটা কিন্তু বলতে পেরেছে। অন্যরা তো গল্পও বলতে পারে না।
রাফি ভাইয়ের কাছে বিদায় নেবার পর অর্ণব বললো, ভাই খুব ক্ষুধা লাগছে। আসেন আগে খেয়ে নেই। কই খাই, কই খাই। বসুন্ধরার লেভেল এইটে বিএফসিটা ভাল ছিল। কিন্তু দেখলাম লোকজন সিনেমা দেখে ওইদিক দিয়া বের হইতেছে। ওইখানে নাসিফ আমিনের সাথে দেখা। আয়নাবাজির টিকেট কাটতে গেছে। কিন্তু টিকেট পাচ্ছে না। মেশিন নষ্ট। বললো, টিকেট সংকট থাকতে পারে। টিকেট সংকট হলে ভাল। কিন্তু না হলে সমস্যা। নাসিফকে দেখে মনে হলো আমি ভাগ্যবান। ও যে সিনেমার টিকেট পাচ্ছে না সে সিনেমা দেখে আমি বের হয়েছি। সিনেমাটা নিয়ে আগ্রহ তাতে বাড়লো।
নাসিফের কাছে বিদায় নিয়ে আবার যেপথ দিয়ে সিনেমা দেখে বের হইছিলাম সেই পথে গেলাম। দেখলাম, কয়েকটা ক্যামেরার সামনে নায়ক নায়িকারা উচ্ছ্বসিত প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে। দেখলাম, মানস চৌধুরীও ক্যামেরায় কথা বলছেন।
দেখে আবার আমরা এদিক সেদিক ঘুরতে থাকলাম। ভিড়ভাট্টা প্রচুর। কোথাও সুবিধা হবে বলে মনে হইলো না। বললাম, কাওরান বাজারে না অনেক খাবারের দোকান ছিল সেইগুলাতে যাই। সিটি থেকে বের হইলাম। মেরিন নামে একটা রেস্তোরাঁ ছিল। সেইটা সুবিধার লাগলো না। পাশে একটা কুকারস সেভেন। সেখানে দেখলাম কেমন একটা বোটকা গন্ধ। কয়েক বছর কাওরান বাজারে আসি না। অনেক চেঞ্জ হইছে।
শেষে গিয়া স্টারে ঠেকলাম। রিচ ফুড খাবো না, গতকাল সিদ্ধান্ত নিছি। তাই আর খিচুড়ি বা বিরিয়ানির দিকে গেলাম না। ভাত নিলাম। সঙ্গে খাসির রেজালা। তাই রুই আর রূপচান্দাও নিলাম। রুইটা এভারেজ। কিন্তু খাসি আর রূপচান্দা চমৎকার।
খাইতে খাইতে নাসিফ আমিনের কথা চিন্তা করতেছিলাম। ওর মতো টপক্লাস বুদ্ধিজীবী আয়নাবাজি দেখার জন্য টিকেট কাটতে গেছে এ্ইটা তো কম কথা নয়। নিজের কথা বাদ দিলাম। আমি কালকে থেকে অর্ণবের পেছনে লেগে আছি। আয়নাবাজি দেখবোই দেখবো। অর্ণব না পেরে নিয়ে গেছে। ওর বন্ধু আমাদের দুজনকে টিকেট দিয়েছেন।
মূলত ট্রেলার দেখে আমি আগ্রহ পাইছি। ট্রেলার খুব ভাল হইছে। ট্রেলার দেখে মনে হয় ক্রাইম থ্রিলারের প্রথম পার্ট। টানটান উত্তেজনা নিয়াই দেখতে গেছিলাম আসলে, যে এরপর কী হইলো।
অনেকেই আগ্রহ নিয়া গেছেন। ঢুকতে গিয়া প্রথমেই দেখা হইলো, ঔপন্যাসিক আনিসুল হকের সঙ্গে। বললাম, আনিস ভাই কেমন আছেন। হাতও টাচ করলাম। কিন্তু উনি আমাকে খেয়াল করলেন না। কার উদ্দেশে জানি বললেন, এই মেরিনা আর রঞ্জনার টিকেট দিছো। তারপর কিছুদূর গিয়া কয়েকজন ভক্তের সঙ্গে সেলফি তুলতে থাকলেন। এই সেলফি জিনিশটা জাতিকে শেষ কইরা দিল। আনিস ভাই আমার মতো বুদ্ধিজীবীকে না চিনে সেলফিগুলোকে জড়ায়ে ধরতেছেন। হায়। এ জাতির কী হবে।
খাইতে খাইতে অর্ণব বললো, ভাই, একটা গরমিল কিন্তু পাইছি।
কী?
আয়না ছিল একটা তরুণ। জেলখানায় গেল নকল গোঁফ লাগায়ে। কিন্তু জেলের ভাত খাইতে খাইতে ওর যে দাড়ি গোঁফ গজাইলো সেইটা কিন্তু বয়স্ক লোকের।
বললাম, হেভি জিনিশ ধরছেন তো।
তবে আমার মনে হইলো, সিনেমাটা যারা বানাইছে তাদের সাংবাদিকদের সম্পের্কে কোনো ধারণা নাই। এই ক্রাইম রিপোর্টার ওরা কই পাইলো। এমন লুথা সাংবাদিক তো ভূভারতে নাই। ডিভোর্স দিয়া বউ চইলা গেছে বাচ্চা নিয়া। হের রিপোর্ট পত্রিকায় চাপতে চায় না। রাতদিন মদ খায়। এক আয়নার পিছনে ঘুরতে ঘুরতে তার জীবন শেষ। সিনেমার অন্যতম প্রধান চরিত্র এই লুথা সাংবাদিক। খুবই লজ্জার কথা। সিনেমায় তার একমাত্র অবদান ফাঁসির আসামীর কাছে মেয়েটারে নিয়ে যাওয়া। এই সাংবাদিকই সিনেমার বারোটা বাজায়ে দিছে। অথচ এই সাংবাদিক একটু জোরালো ভূমিকা নিলেই কিন্তু সিনেমাটা জমতো। সাংবাদিক তো শুরু থেকে সব কামেই ধরা খাইলো। সাংবাদিক জাতির ইজ্জতটা মাইরা দিছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অভাব প্রকট মনে হইলো।
অর্ণব বলে, ভাই এইগুলা আবার ফেসবুকে লেইখেন না।
আমি বললাম, তাই কি লেখা যায়। সাংবাদিক হয়ে সাংবাদিক জাতির এই ইজ্জত নিয়া কি ফেসবুকে লেখা সম্ভব?
তবে সিনেমার সবচেয়ে ভাল ব্যাপার কী জানেন?
ডিটেইলসে খুব মন দিছে। ছোট ক্যারেকটারগুলা খুব ভাল ফুটছে। সিনেমাটোগ্রাফি ভাল হইছে। অনেক দৃশ্য ডিটেইলে খুব ভাল আসছে। ছোট ক্যারেকটার সবই ভাল। কিন্তু বড় ক্যারেকটারগুলা ধরা খাইছে। বিশেষ করে সাংবাদিক। উফ।
তাইলে কী দাঁড়াইলো।
আমাদের মতো বুদ্ধিজীবীদের জন্য সিনেমাটা একটু কম কম।
আর সাধারণদের জন্য একটু বেশি বেশি হবে।
তারমানে কী?
আরেকটু স্পাইসি হলে আরেকটু থ্রিলিং হইলে ভাল হইতো। কিন্তু যা হইছে তাতেও চলবে। খরচ উঠে আসবে।
স্টার থেকে বের হয়ে তো আর সিএনজি পাই না।
ডাইন দিকে পুরা জ্যাম। বামে ফাঁকা।
আরেকটু দেরি হইলে আমরাও রাস্তায় ধরা খাইতাম।



মাহবুব মোর্শেদ
জন্ম: ২৯ জানুয়ারি, ১৯৭৭
লেখক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক
অনলাইন এ