"/> অন্তর্জাল

রোহিঙ্গাঃ মগের মুল্লুকে বাঙালী (২)
মাসুদ রানা -11/22/2016





বার্মার রাখাইন প্রদেশে যে-সংখ্যালঘু মুসলমান জনগোষ্ঠী সেখানকার সংখ্যাগুরু বৌদ্ধ রাখাইনের হাতে গণহত্যা-সহ বিভিন্ন ধরণের নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন, তাঁরা ‘রোহিঙ্গা’ আত্মপরিচয় দাবী করছেন। কিন্তু বার্মা-সমাজের প্রধান স্রোতধারার মানুষ ও সরকার তাঁদের এই আত্মপরিচয় মানছেন না। বলা হচ্ছে, ওরা বাঙালী।উপরের প্রেক্ষাপটে যাঁরা মনে করেন, রোহিঙ্গা আত্মপরিচয়দানকারী জনগোষ্ঠীর অস্বীকৃতি ও নিপীড়নের কারণ হচ্ছে তাঁদের ‘মুসলমানত্ব’, তাঁদের ধারণা সম্ভবতঃ ভুল। ভুলের সম্ভাবনা এই জন্যেই যে, বার্মাতে রোহিঙ্গা ছাড়াও অন্য একাধিক জনজাতির মুসলমান আছেন, যাদের ওপর এই নিপীড়ন হচ্ছেন না।

আমি আমার আগের লেখায় বলেছি, উত্তরাঞ্চলীয় বার্মাতে ‘পানথাই’ নামে সমধিক পরিচিত চীনের হান বংশোদ্ভূত ‘হুই’ জনগোষ্ঠী মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা জনজাতিক উচ্ছেদের সম্মুখীন নন। এমনকি, খোদ রাখাইন প্রদেশে ‘কামান’ নামের মুসলমান জনগোষ্ঠী ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের পুরোদস্তুর নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে নাগরিক মর্যাদা ভোগ করছেন। তাহলে, রোহিঙ্গা আত্মপরিচয়দানকারী মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে কী এমন আছে, যার কারণে তাঁরা জনজাতিক উচ্ছেদের সম্মুখীন হচ্ছেন? এ-প্রশ্নের উত্তর কী, তা বুঝে নিতে হবে বার্মা সরকার তাঁদেরকে কী নামে চিহ্নিত করছে, তার মধ্য দিয়ে।

রোহিঙ্গা সমস্যা বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে, বিষয়টি জাতিসংঘে গড়ায়। সেই জাতিসংঘের কাছে বার্মা সরকার গতবছর বলেছে, রোহিঙ্গারা যদি তাঁদের ‘বাঙালী’ জনজাতিক পরিচয় স্বীকার করে, তাহলে তাদেরকে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। বার্মার পররাষ্ট্রমন্ত্রী উনা মং লুইন ২০১৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে দেওয়া তাঁর ভাষণে এ-কথা ঘোষণা করেন। একই বছরের ১ অক্টোবরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দ্যা হিন্দু জানাচ্ছেঃ



    “Myanmar has confirmed to the United Nations that it is finalising a plan that will offer minority Rohingya Muslims citizenship if they change their ethnicity to suggest Bangladeshi origin...Rohingya would be required to register their identities as ‘Bengali,’ a term most reject because it implies they are illegal immigrants from Bangladesh despite having lived in the area for generations.” (http://www.thehindu.com/news/international/citizenship-if-rohingya-identify-as-bengali/article6462706.ece)অর্থাৎ, “মায়ানমার জাতিসংঘের কাছে নিশ্চিত করেছে, দেশটি এই মর্মে একটি পরিকল্পনা চূড়ান্ত করছে যে, রোহিঙ্গা মুসলমানগণ যদি তাঁদের জনজাতীয়তা পরিবর্তন করে বাংলাদেশী মূল স্বীকার করেন, তাহলে তাঁদেরকে নাগরিকত্ব প্রদান করা হবে... রোহিঙ্গাদেরকে তাঁদের আত্মপরিচয় রেজিষ্টারভূক্ত করতে হবে ‘বাঙালী’ হিসেবে। এটি এমন একটি অভিধা যা অনেকেই প্রত্যাখান করেছেন, কারণ এটি মানার অর্থ হবে প্রজন্মন্তার ধরে এই অঞ্চলে বাস করার পর তাঁরা বাংলাদেশ থেকে আগত অবৈধ অভিবাসী।”



আমি নিজে একজন বাঙালী হিসেবে আমার জাতির অতীত ইতিহাস, বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যত সম্ভাবনা জানতে চাই ও বুঝতে চাই। এহন আমি যখন শুনি বাংলাদেশের বাইরে একটি জনগোষ্ঠীকে বাঙালী হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং তাঁরা গণহত্যার শিকার হচ্ছেন, তখন আমি তাঁদের সম্পর্কে অনুসন্ধান না করে নির্বিকার থাকতে পারি না। বার্মার রোহিঙ্গারা বাঙালী কিনা, তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমার কাছে রূপতঃ কেঁচো খুড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়েছে। আর, এই সাপ হচ্ছে বাংলা থেকে বাঙালী জাতির লোকদেরকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেওয়ার ভয়াবহ ইতিহাস। এই ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে পর্তুগীজ ও মগ (রাখাইন) দস্যুদের বাংলা আক্রমণ ও বাঙালীদের ধরে নিয়ে পার্শ্ববর্তী আরাকান রাজ্যে (বর্তমান বার্মার রাখাইন প্রদেশে) দাসে রূপান্তর কিংবা দূরবর্তী অঞ্চলে বিক্রয়ের হৃদয়বিদারক ঘটনা। বাঙালীদের দাসায়িত করার কাহিনী সম্পর্কে আমি প্রথম রেফারেন্স দিতে চাই আরাকানের ম্রোহং রাজ্য সম্পর্কে ‘এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিট্যানিকা’র তথ্যভাণ্ডার থেকে। সেখানে বলা হয়েছেঃ



    "King Narameikhla founded a strong, stable kingdom in 1433. In 1531 the first European ships appeared in the region, and Portuguese freebooters began to settle at Chittagong. Mrohaung’s navy, under the leadership of King Minbin and with Portuguese assistance, was the terror of the Ganges River region. Arakan’s neighbour and traditional antagonist, Bengal, was weak; the freebooters raided there at will, carrying hundreds of slaves off to Arakan. For almost a century Mrohaung retained its naval power.” অর্থাৎ, “১৪৩৩ সালে রাজা নারামিখলা একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। ১৫৩১ সালে এই অঞ্চলে ইউরোপীয় জাহাজসমূহের আবির্ভাব ঘটে এবং চট্টগ্রামে পর্তুগীজ জলদস্যুগণ স্থায়ী হতে শুরু করে। রাজা মিনবিনের নেতৃত্বাধীন ম্রোহং নৌবাহিনী পর্তুগীজ সহযোগিতায় গাঙ্গেয় অঞ্চলে ত্রাস হিসেবে আবির্ভূত হয়। (এসময়) আরাকানের প্রতিবেশী ও প্রথাগত বৈরী বাংলা ছিলো দূর্বল; জলদস্যুরা সেখানে ইচ্ছেমতো হানা দিতো এবং শতো-শতো দাস আরাকানে ধরে নিয়ে যেতো। প্রায় এক শতাব্দী যাবত ম্রোহং এই নৌশক্তি ধরে রাখতে সক্ষম হয়।”
 


আমাদের ভাবার বিষয় হচ্ছে, প্রায় এক শতাব্দী ধরে ম্রোহং নৌশক্তি যদি বাংলা থেকে এভাবে বাঙালীদেরকে ধরে দাস হিসেবে আরাকানে নিয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে এই দাসেরা গেলো কোথায়? ইতিহাস বলে, আরকার ছিলো সমুদ্রপথে বিশ্বব্যাপী দাস ব্যবসায় বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের শ্রেষ্ঠতম কেন্দ্র। আরাকান থেকে কোন-কোন দেশে বাঙালী দাসদের পাচার করা হয়েছে সেটি বিশাল গবেষণার বিষয়। স্বস্তির বিষয় হলো যে, ‘বেঙ্গলি স্লেইভস’ বা ‘বাঙালী দাস’ বিষয়ে গত কয়েক বছর ধরে এ্যাডেমিক জগতে গবেষণা শুরু হয়েছে। দিল্লির স্কুল অফ ইকোনমিক্সের অধ্যাপক ওম প্রকাশের প্রারম্ভিক গবেষণা থাকলেও আফ্রিকাতে অধ্যাপনায় দীর্ঘকাল কাটানো বাঙালী অধ্যাপক অংশু দত্ত বিস্তর গবেষণা করে ‘বেঙ্গল টু দ্যা কেইপঃ বেঙ্গলি স্লেইভস ইন সাউথ আফ্রিকা’ শিরোনামের একটি মনোগ্রাফ প্রকাশ করেছেন ২০১৩ সালে। অধ্যাপক অংশু দত্ত তাঁর মনোগ্রাফে দেখিয়েছেন, ওলন্দাজ জাহাজগুলো দীর্ঘকাল ধরে দক্ষিণ আফ্রিকার কেইপটাউনে বাঙালী দাস-দাসীদের নিয়ে গিয়ে দাসবাজারে বিক্রি করেছে। বাঙালীদের দাস হিসেবে বিক্রি করার গবেষণালব্ধ কাহিনী যা অংশু দত্ত সংগ্রহ করেছেন, তার ওপর আমি পৃথক একটি লেখায় আলোকপাত করবো। বর্তমান রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে আমি বাঙালী দাসের বিষয়টি আরাকানে সীমিত রাখছি।আরাকানে বাঙালীদের দাস হিসেবে ধরে নিয়ে যাওয়ার কাহিনীর দ্বিতীয় যে-উৎস আমি নির্দেশ করতে চাই, তা হচ্ছে বার্মার ন্যাশনাল ম্যাগাজিন গার্ডিয়ানের রেঙ্গুন ভল্যুমঃ ৭, নং ১০, ১৯৬০ সালের অক্টোবর সংখ্যায় ‘স্লেইভ রেইড ইন বেঙ্গল অর হীনস ইন আরাকান’, যার লেখক উ বা থা। এই লেখায় উ বা থা বাংলায় মগ ও পর্তুগীজদের মিলিত হানা ও বাঙালীদেরকে দাস হিসেবে ধরে নিয়ে বিভিন্ন বন্দরে বিক্রি ও আরাকানে বিভিন্ন কাজে নিযুক্ত করার ইতিহাস তুলে ধরেছেন। নীচে সেখান থেকে দু’টি অনুচ্ছেদ উদ্ধৃতি করছিঃ
 


    “Before Moghul administration was extended to Bengal, the Arakanese claimed a large part of Bengal. Moghul Emperors established themselves in western and central Bengal, and they confined the Arakanese to the province of Chittagong, the North-west frontier vice-royalty of the Arakanese king who got half the booty from piracy. The Portuguese were formidable fighters. So instead of destroying them the King of Arakan enlistedteh Portuguese in his service as a force to guard his north-west frontier. They were granted estates. They had no subject control from Goa. They served the Arakanese king in holding Sandwip Island, Noakhali, Bakergunje, and the Sundarbans Delta; and they raided up to Dacca and even Murshidabad." অর্থাৎ, “বাংলায় মুঘল শাসন বর্ধিত করার আগে আরাকানীরা বাংলার একটি বিরাট অংশ দখল করে নেয়। মুঘল সম্রাটগণ পশ্চিম ও কেন্দ্রীয় বাংলায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেন এবং তাঁরা আরাকানীদের আবদ্ধ রাখেন চট্টগ্রাম বিভাগে, যা ছিলো এমনই আরাকানী রাজার উত্তর-পশ্চিম উপনিবেশ, যিনি তাঁর অর্ধেক রাজস্ব পেতেন জলদস্যুতা থেকে। পর্তুগীজেরা ছিলো দুর্দান্ত যোদ্ধা। তাই আরাকানের রাজা পর্তুগীজদের ধ্বংস করার পরিবর্তে, তাদেরকে তাঁর উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত রক্ষী হিসেবে নিজের সেবায় নিয়োজিত করেন। তাদেরকে জমিদারী দেওয়া হয়। তাদের ওপর গোয়ার (ভারতে পর্তুগীজ উপনিবেশ) নিয়ন্ত্রণ ছিলো না। আরাকানী রাজার সেবায় তারা সন্দ্বীপ দীপ, নোয়াখালি, বাকেরগঞ্জ ও সুন্দরবন বদ্বীপ দখলে রেখে ঢাকা ও এমনকি মুর্শিদাবাদ পর্যন্ত হানা দিতো।"

"The King of Arakan encouraged them to make slave raids west-wards. The Arakanese Mughs and the Portuguese made slave raids upon delta villages of the Sundarbans. They made Sangar Island at the mouth of the Hooghly River uninhabitable. They sold the Bengalis (Hindus and Muslims), so kidnapped, at the Indian ports and to the Arakanese who used them in ploughing, reaping rice crop, earth-digging and in several hard works which could not be done by the Arakanese. They pierced the hands of their slaves, and passed a strip of cane through the hole. They flung them under the deck strung together like hens. Sometimes the Mughs would sail back to the coast where they had captured their captives and wait till the villagers brought out sufficient gifts to get back their relations. This the Mughs called collecting revenue, and the Portuguese who were also among them would keep regular account books.”অর্থাৎ, "আরাকানের রাজা তাদেরকে পশ্চিমমুখী দাস-হানা দেওয়ার জন্যে উৎসাহ দিতেন। আরাকানী মগ ও পর্তুগীজরা সুন্দরবান অঞ্চলের উপকূলীয় গ্রামে দাস-ধরার জন্যে হানা দিতো। তারা হুগলী নদীর মুখে সাঙ্গর দ্বীপকে বসতিহীন করে তোলে। তারা বাঙালীদের (হিন্দু-মুসলিম) অপহরণ করে ভারতীয় বন্দরগুলোতে ও আরাকানে বিক্রি করতো। আরাকানীরা বাঙালী দাসদের দিয়ে এমন সব কঠিন পরিশ্রমের কাজ করতো, যা সাধারণতঃ আরাকানীরা করতে চাই তো না। যেমনঃ মাটি খনন, ধান চাষ, ধান কাটা, ইত্যদি। তারা তাদের দাসদের হাত ফুটো করে সেই ফুটোর ভেতর দিয়ে বেতের ফালা ঢুকিয়ে নৌযানের পাটাতনের নীচে মুগরীর মতো একত্রে বেঁধে, ফেলে রাখতো। কখনও কখনও মগেরা উপকূলে ফিরে এসে বন্দীদের নিয়ে অপেক্ষা করতো তাঁদের আত্মীয়দের কাছ থেকে পর্যাপ্ত মুক্তিপণ আদায়ের জন্যে। এভাবেই মগেরা উপার্জন করতো এবং পর্তুগীজেরা হিসাবের খাতায় তা লিখে রাখতো।”

 

বাঙালীদের দাস করে আরাকানে নিয়ে যাওয়ার কাহিনী এ্যাকাডেমিক ফর্ম্যাটে দেখতে পাই লণ্ডন স্কুল অফ ওরিয়েণ্ট্যাল এ্যাণ্ড আফ্রিকান ষ্টাডিজের ‘সোয়াস বুলেটিন অফ বার্মা রিসার্চ, ভল্যুম ৩, নাম্বার ২, অটাম ২০০৫’ সংখ্যায় প্রাকশিত “দ্যা ডিভোলপমেণ্ট অফ এ্যা মুসলিম এনক্লেইভ ইন আরাকান (রাখাইন) ষ্টেইট অফ বার্মা (মায়ানমার)” শীর্ষক সেমিনারপত্রে। এই সেমিনারপত্রের লেখক জাপানের কাণ্ডা ইউনিভার্সিটি অফ ইণ্টারন্যাশনাল ষ্টাডিজের অধ্যাপক আই চ্যান (Prof. Aye Chan) তাঁর লেখাটা প্রথম উপস্থাপন করেন ২০০৩ সালের ৪-৫ ফেব্রুয়ারীতে জাপানের কোবে ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত দক্ষিণপূর্ব এশীয় ইতিহাসবিদদের ৭০তম

মাসুদ রানা
লেখক, বিশ্লেষক
লণ্ডন, ইংল্যাণ্ড।