"/> অন্তর্জাল
ঢাকা ফোক ফেস্ট, ফোক মিউজিক, মিলান কুন্ডেরা
মিলান কুন্ডেরার ‘দ্যা জোক’ ও ফোকচর্চা
শফিউল জয় -06/29/2016






সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায়  আয়োজিত ও আলোচ্য ‘ফোক’ ফেস্টিভিটি, আলোচনা সমালোচনা, বাদন, গায়কী সর্বোপরি ‘ফোক মিউজিক’-কে প্রধান ধারাতে তুলে আনার নানা কসরত ও হিড়িক স্মরণ করতে গিয়ে বিশেষভাবে মাথায় আসছিল মিলান কুন্ডেরার ‘দ্যা জোক’ উপন্যাসটির কথা। ইতিহাসের পরিক্রমা বলে এই ধরণের প্রচেষ্টা ও সংকল্প একটা না-পুঁজিবাদী থেকে ধাবমান পুঁজিবাদী সমাজের জন্যে অত্যাবশ্যকীয় দশা; বিশেষ করে পরিচয় নির্মাণের আধুনিক অসরল রাজনীতিতে। পরিচয় রাজনীতি ও বৈশ্বিক আমেজ ধারণ করার জন্যে একটা জনগোষ্ঠীর ভেতরকার ঐতিহ্যগত কাঠামোকে অবশ্যই পুনরুৎপাদনের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। তার একটা প্রতিসারী রূপই হয়তো আমরা কিছুটা আঁচ করতে পারি অধুনা এইসব আচারে।

‘দ্যা জোক’ উপন্যাসটির প্রকাশকাল ১৯৬৭, যখন কুন্ডেরার দেশ, কাল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার তাবেদার বাহিনীর দ্বারা আক্রান্ত। অন্যতম প্রধান চরিত্র লুদ্ভিকের ব্যক্তিগত এক চিঠিতে  ঠাট্টাচ্ছলে ‘অপ্টিমিজমকে জনতার আফিম’ বলাকে কেন্দ্র করে উপন্যাসের সূত্রপাত  এবং উপসংহার সূচিত হয়েছে তাঁর বন্ধু ও কমিউনিস্ট আদর্শে উদবুদ্ধ জারোস্লাভের হৃদযন্ত্রের বৈকল্যের মাধ্যমে জ্বলজ্বলা মোটরঅ্যাম্বুলেন্সের সামনে। বর্ণনাকাঠামো আধেয়কে অনুসরণ করেছে ফ্ল্যাসব্যাক নীতিতে। উপন্যাসের চরিত্র লুদ্ভিক একজন ক্ল্যারিনেট বাদক ও পরবর্তীতে বিজ্ঞানী হিশেবে খ্যাতি অর্জন করেন। পার্টিজান পলিটিক্সের কর্তৃত্ববাদী আচরণের প্রতি এক ধরণের কৌতুকময় দৃষ্টির ছায়া লক্ষ্য করা যায় সম্পূর্ণ উপন্যাসে। এই কর্তৃত্ববাদী আচরণ শুধু তৎকালীন পার্টি পলিটিক্সের প্রতি বিতৃষ্ণায় সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং ঋজু কাঠামো অনুসরণকারী যে কোন ধরনের প্রবর্তনার প্রতি লুদ্ভিক পোষণ করতো একই মনোভাব। সেইসূত্রে তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ফোক মিউজিকের পৃষ্ঠপোষকতা নিয়েও সে ছিল সন্দিহান। তার মতে- রোম্যান্টিকরা ইম্যাজিনারি যে প্রেরণা লক্ষ্য করতেন নিজের সুরে মশগুল কোন ঘাস কাটতে থাকা তরুণীর ভেতর, যা তাঁকে প্ররোচিত করত সুরের মগ্নতায় ডুবে যেতে-  ‘ফোক সং’-এর নির্মিতি এবং বিশিষ্টতা অপরপক্ষের আর্টবিষয়ক সামগ্রিক ধারণা থেকে পৃথক। ‘ফোক মিউজিকে গায়ক বা শ্রোতার ধারণাটা স্বতঃস্ফূর্ততাপ্রসূত। যেভাবে ‘পাঠক ও লেখক’-কে, কিংবা ‘গায়ক ও শ্রোতা’  কে আলাদা শ্রেণীভুক্ত করা হয়, সমাবেত ‘ফোক’ আচারে সেইসব বৈশিষ্ট্য অনুপস্থিত- এর বিশিষ্টতা ছড়িয়ে আছে সমবেত জীবনের নিরুদ্বিগ্ন প্রবাহে। যেখানে একজন আরেকজনের থেকে আলাদা হয়ে গান করেন না, বরং সমষ্টির চেতনায় উদ্বুদ্ধ মানুষেরা স্বাভাবিকভাবেই সুরে নতুন কিছু যোগ করেন, মোটিফে পরিবর্তন আনেন যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে পড়ে। একই গানের একাধিক স্রষ্টা- যেসব শনাক্ত করার কোন গাছপাথর নাই।

পুঁজিবাদের অগ্রসরমান চেতনা যেহেতু এই সমবেত জীবনকে তছনছ করে দিয়েছে, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে  প্রথম কর্তব্য হলো,  ব্যাপকভাবে ‘ফোক সঙ’-কে ‘সমাজতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদী’ (ধারণাটা স্ট্যালিনের) চেতনায় গণমুখী করে তোলার উদ্যোগ নেয়া। ১৯৪৮ সালে তাই গটওঅ্যাল্ড ঘোষণা করেন ‘বুর্জয়া ফর্মালিজম’-এর বিরুদ্ধে জেহাদ, তার প্রতিস্থাপনে ‘ফোক সংস্কৃতি’র ব্যাপক প্রচলনের ব্যবস্থা নেয়া হয় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে। দেশ যেহেতু জনতার, প্রাক্তন এলিট শ্রেণীও বিপন্ন- তাই এখন শুধু গণমানুষের সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটবে। কালো মানুষের সঙ্গীত জ্যাজ যখন সারা বিশ্বে প্রশংসিত- মোরাভিয়ার সমাজের প্রেক্ষাপটে তা ছিল পুঁজিবাদের তল্পিবাহক এবং স্থানীকতার পরিপ্রেক্ষিতে ইতিহাস ঘুরে এলিটের কব্জায়, বুর্জোয়াদের তল্পিবাহক! তাই সীমাহীন সৎ উদ্দেশ্যে জ্যাজকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়।


কুন্ডেরার উপন্যাসটা আমাদের কিছু প্রশ্নের সম্মুখীন করে, যার সমাধানের ইঙ্গিত হয়তো সেভাবে লক্ষ্য করা যায় না উপন্যাসে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এই ধরনের সংস্কৃতিচর্চার ফলস্বরূপ প্রান্তীয় জনগণের সংস্কৃতি হারায় তার স্বতঃস্ফূর্ততা। যেহেতু রোম্যান্টিকদের মতো কবিতা সৃষ্টি করা আর ‘ফোক সং’-এর ধারণাটা সম্পূর্ণ ভিন্ন সামাজিক প্রপঞ্চ থেকে উদ্ভূত- কর্তৃত্ববাদী কোন ক্ষমতাকাঠামোর পৃষ্ঠপোষকতায় স্বাভাবিকভবেই এর চর্চা অসম্ভব। গনমানুষের সংস্কৃতির রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও তার ফলাফল যতোটা সহজ বলে ধারণা করা হয়েছিল, দেখা গেল অত সহজ না। ব্যক্তির কোন ইমেইজ দাঁড়া করানো না গেলে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় একতাবদ্ধতার ধারণাটা ঠিক কাজ করে না, কিংবা এর উল্টোটা- আধুনিক কর্তৃত্বকামী রাষ্ট্র আর ব্যক্তি ইমেইজ একে অপরের পরিপূরক। অর্থাৎ এই ফাঁদে পা দিলে ‘ফোক সংস্কৃতি’ একই সাথে হারাবে সাবলীলতা, প্রবৃত্তিগত বিশিষ্টতা ও সৃষ্টি করতে হবে হায়ারার্কি। লুদ্ভিক বলে- ‘ The propaganda apparatus wants a hierarchy in its gallery of dead heroes. They want a chief hero among heroes’.



 

সাম্প্রতিক সময়ের স্পন্সরশাসিত ফোক ফেস্টিভ্যাল, লোকগান, লোকসঙ্গীত ও নানাবিধ নাগরিক ‘ফোককালচার’ চর্চার ভেতরকার স্ববিরোধটা ঠিক এখানেই আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে । পুঁজিবাদী- না পুঁজিবাদী  বা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা- কোন আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থাই  হায়ারার্কি তৈরি করা ছাড়া নিজেদের অবস্থানকে পোক্ত করতে পারে না, নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণ করাও সম্ভবপর হয় না। লালনকে একচ্ছত্রভাবে বাউল হিশেবে রিপ্রেজেন্ট করাটাও এই হায়ারার্কির অন্তর্গত, যেমনটা শাহ আবদুল করিম কিংবা হাল আমলের মাতাল রাজ্জাকের ক্ষেত্রে- একটা ফোকাস পয়েন্ট তার অনবরত সৃষ্টি করা চাই নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করার জন্য, অস্তিত্ব টেকানোর অভিপ্রায়ে, যেটা  ‘ফোক সংগীতের’ অগ্রগণ্য শত্রু। মনে রাখা উচিত, ‘ফোক সিঙ্গার’, ‘ফোক মিউজিক’ ক্যাটাগোরাইজেশন হচ্ছে বর্তমান অন্তঃসারশূন্য অবস্থাকে টিকায়া রাখার প্রধান শব্দসন্ত্রাস।

লুদ্ভিক জারোস্লাভকে বলেছিল- ‘তুমি আমাকে এমন একজন যৌথকৃষক দেখাও যে তোমার যৌথখামারের গান আনন্দের জন্যে গায়’। গোত্রভুক্ত সমাজের যে বৈশিষ্ট্য ‘ফোক সং’ এ লক্ষ্য করি, তা আধুনিক যে কোন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকাঠামোর, বা এর অন্তর্ভুক্ত যে কোন ক্ষমতাচর্চাকারী প্রতিষ্ঠানের ভেতরে আনতে গেলে তা ব্যর্থ ও আচারসর্বস্ব হতে বাধ্য। সহজাত কারণেই হারাবে তার অন্তরঙ্গ বিশিষ্টতা, সমষ্টিগত প্রেরণা এবং মুখ্য হয়ে উঠবে একজন লালন বা হাছন রাজা, শাহ আব্দুল করিম। একতাবদ্ধতার সামাজিক নিরুদ্বিগ্ন আর্টের ধারাটা যেভাবে ক্ষতি করতে পারে পুঁজিবাদ, একইসূত্রবাহিত হয়ে ভিন্ন বেশে খুন করতে পারে সমাজতন্ত্রও। ঝর্ণার প্রবাহের স্বতঃস্ফূর্ততা আর ফোয়ারার সৌন্দর্য আলবৎ ভিন্ন! অবশ্য এই সিদ্ধান্ত অবশ্যই অতীতপ্রেমের প্রতি পক্ষপাতের কোন দায় নেয় না, বা ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’ আমেজের অরণ্যে রোদনও বলা চলে না একে।


টেলিভিশন রেডিও সোশ্যাল নেটওয়ার্ক তথা সর্বাধুনিক মিডিয়া ও এর চর্চিত ব্যক্তিচরিত্রের পূজনীয় মনোবৃত্তির সাথে একজন গায়কের মোকাবেলার জায়গাটা যদি পরিষ্কার না হয়, তাহলে অন্তঃসারশূন্য এইসব মধ্যবিত্ত প্রচেষ্টার কোন গুণগত পরিবর্তন আসা বহুত দূরের স্বপ্ন; তা ‘ফোক মিউজিক’ নিয়ে যতই উৎসব করি না কেন। মুহুর্মুহু বৈশ্বিক ফোক ফেস্টিভ্যালই পরিবর্তন আনার অন্তরায়! এইসব আচারসর্বস্ব আধুনিকতার নিষ্প্রাণ কচকচানি সমবেতভাবে কোন পরিবর্তনের কথা বলতে চূড়ান্ত ব্যর্থ।

ষাটের দশকের পরবর্তী মিউজিক মহিরথীদের নাম করতে গেলে ‘পিঙ্ক ফ্লয়েড’-এর নাম প্রথম নিঃসন্দেহে সারিতে। পিঙ্ক ফ্লয়েড ব্যান্ডটা ভাঙার অন্যতম কারণ ছিল া নিয়ে অন্তর্কলহ- নিক ম্যাসনের পিঙ্ক ফ্লয়েড নিয়ে বই ‘ইন্সাইড আউটঃ অ্যা পার্সোনাল হিস্ট্রি অফ পিঙ্ক ফ্লয়েড’ এ বারবার উঠে এসেছে এ কথা। উঠে এসেছে রজার ওয়াটার্স  আর গিলমোরের নেতৃত্বজনিত জটিলতা কথা। ‘দ্যা ফাইনাল কাট’ অ্যালবামের পর রজার ওয়াটার্স বাকী ত্রয়ীর সাথে মামলার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করেন, কে হব ‘পিঙ্ক ফ্লয়েড’ নামের বাহক। সেই সময়ে আর্থ-রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে যাপিত জীবনের সাথে সংগীতের সম্পর্কটা ক্যামন হবে তা নির্ণয় করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করাই ছিল বরং এক স্পর্ধিত পদক্ষেপ।

আধুনিক ক্ষমতাকাঠামোর ছাতার নিচে  প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ইউটিউব সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং ইত্যাদিতে ‘ফোক’ মিউজিক নিয়ে যে আদিখ্যেতা লক্ষ করা যায়- তা তাঁর অন্তর্নিহিত কাঠামোর স্ববিরোধিতার কারণেই জীবনবিচ্ছিন্ন একটা উপস্থাপনা। ওয়ানা বি পুঁজিবাদী সমাজে কর্পোরেট স্পন্সরশিপে ‘ফোক’ ফেস্টিভ্যাল আয়োজন ক’রে যেসকল নাগরিকবৃন্দ, ব্যক্তি, ব্যান্ড ইত্যাদি ‘ফোক মিউজিক’- কে নানা মিডিয়ায় ও মিডিয়া চর্চিত পরিচয় ক্ষমতার প্রতিনিধিত্বের দায় নিচ্ছে, অনবরত সৎ অভিপ্রায়ে এক ধরনের এনজিওসুলভ উন্নয়ননীতি মনোভাবে কাজ করে যাচ্ছে, কোক স্টুডিও মাতাচ্ছে, বাংলাদেশি গান কোক স্টুডিওতে শুনে যারা উদ্বেলিত হয়ে উঠছে, বানাচ্ছে এক্সপেরিমেন্টাল ফিউশান, রিমেইক- সামষ্টিকভাবে একই কারণে এইসব মুখ থুবড়ে পড়বে। সুরের কোন দেশ নাই- ‘ফোক’ মিউজিককে এই ধরনের ইউনিভার্সালিস্ট প্রশংসাসূচক বাক্যে ভূষিত করার কায়দাটাও আসলে একে এর  সাংস্কৃতিক ও যাপনভিত্তিক প্রেক্ষাপটের বাইরে ঠেলে দেয়ার প্রয়াস;  জীবনবিচ্ছিন্ন সঙ্গীত সৃষ্টিকে এই ধরনের ভাবালুতাপূর্ণ কথাই কিনা উৎসাহিত করতেছে। কুন্ডেরার উপন্যাসে উল্লেখিত মোরাভিয়ায় জ্যাজ মিউজিকও তার সম্ভাব্য উদাহরণ; কীভাবে আফ্রিকার  জ্যাজ হয়ে উঠতে পারে পৃথিবীর কোন এক প্রান্তে জালেমের হেজেমনি। এইসব সম্ভাব্যতা, সম্ভাব্যতা পৃথিবীর আবর্তনের জটিল মারপ্যাঁচ। একসময় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ইউটোপিয়ান দোহাই দিয়ে অনাগত সোনালী দিনের কথা ভেবে স্বস্তি পাওয়ার উপায় ছিল। সেই স্বস্তির যে ভিত্তি নাই- ইতিহাস বা কুন্ডেরার উপন্যাসটা সেটা জানানোর ভূমিকাটা নেয় অ্যাম্বুলেন্সের দিকে জারোস্লাভের এলায়া পড়া শরীর টেনে নেয়ার মধ্য দিয়ে, রাষ্ট্রীয় মহৎ ব্যবস্থাপনায় নয়টা পাঁচটার বাঁধাধরা ‘ফোক আর্টিস্ট’ হতে চায় না যে জারোস্লাভ,  যে শ্রোতাদের সামনে বোধ করে নিরন্তর বিচ্ছিন্নতা।



শাফিউল  জয়
জন্ম: এপ্রিল ১৯
লেখক, অনুবাদক
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে