"/> অন্তর্জাল
বাংলাদেশ
দাবাং, সালমান খান ও আমাদের পুলিশ: এডিসি বাবুলের নিরপরাধ স্ত্রী
জিয়া হাসান -06/05/2016





অনেক দেশে যাইনি কিন্ত, অল্প যে কয়েকটি দেশে গিয়ে আইনের শাসন দেখেছি, সেই খানে কোন পুলিশ অফিসার বাবুল আক্তারের দাবাং এর মত সালমান খান, বা জঙ্গি দমনের পাব্লিক হিরো ওয়ার সুযোগ নাই। বলার অপেক্ষা রাখেনা, বিডিআর হত্যায় নিহত কর্নেল গুলজারকে হিরো বানানো নিয়েও আমার এই আপত্তি বহাল।

ক শো দেখিনা, সুই-ফাল ডাক্তার ইমরানের প্রতিও কোন মহব্বত নাই। কিন্ত, আজকে থেকে কয়েক মাস আগে, মটু পাতলু দেখা ছেলের হাত থেকে রিমোট কেড়ে নেয়ার পাপের ন্যাচারল জাস্টিস হিসেবে একটা টকশোতে ঢুকে পড়ি এবং জীবনে প্রথম বার ডাক্তার ইমরানের প্রতি সিম্প্যাথি অনুভব করি।

বেশী ডিটেলস খেয়াল নাই, খেয়াল আছে টকশোটিতে ডাক্তার ইমরানের মুখোমুখি ছিল, র‍্যাবের ডিজি বেনজির সাহেব।

একজন পাব্লিক সারভেন্ট হয়ে তার গলার টোন, ভয়েস, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ সব কিছুতেই কলোনিয়াল মাস্টারদের যে ঔদ্ধত্য চুইয়ে চুইয়ে পড়ছিল,তা দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেছিলাম। একজন পাব্লিক সারভেন্ট টিভিতে পুরো রাষ্ট্রের সামনে কারো সাথে এই ভাবে কথা বলতে পারে বিশ্বাস হচ্ছিলনা।

কয়েকটা জিনিষ খেয়াল আছে যেখানে তিনি ইমরানকে বলছিলেন । আপনার সিকিউরিটির জন্যে আমি ৭ হাজার টাকা খরচ করে গাড়ি ভাড়া করেছি। এমন ভাবে বলতেছিলেন যেন, তিনি নিজের বেতনের টাকা থেকে টাকাটা খরছ করতেন, সেইটা পাবলিক মানি নয়।

তারপর খেয়াল আছে এই রকম বলছিলেন, এই দেশে অনেকে তাদের মত বিদেশ থেকে ট্রেনিং পাওয়া এক্সপার্টকে জ্ঞান দেয়। যেইটা তিনি হাস্যকর ভাবনা হিসেবে দেখিয়ে, উড়িয়ে দিচ্ছিলেন।

এই দেশে নন টেকনিকাল লোকের জ্ঞান দেয়ার বদ অভ্যাসের চর্চাটা ঠিক নয় স্বীকার করেই বলতে হবে, সারভিস সেক্টরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাগরিকের সব ধরনের সাফারিং থেকে আসা কমনসেন্স মতামতকে যেই ভাবে উড়িয়ে দিয়েছিলেন তাতে মনে হয়েছিল- এতো আত্মনিমগ্ন ম্যগ্লোম্যানিয়াক কোন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষে থাকলে সেই প্রতিষ্ঠানের পজিটিভ চেঞ্জ অসম্ভব।

এইটা ছাড়াও বিগত দুই বছরে পুলিশ বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য এবং নিম্ন শ্রেণির কর্মকর্তাদেরকে সম্পূর্ণ আওয়ামী করন করার যে তথ্য পাচ্ছিলাম- তাতে সেই টকশো দেখে এই উপলব্ধি হয়েছিল – ১৯৯৬ সালে জনতার মঞ্চ স্থাপনের মাধ্যমে প্রশাসনকে রাজনীতির সাথে একিভুত করার যে চাক্ষুষ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, ২০১৬ সালে এসে সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। ২০ বছর লেগেছে, কিন্ত ড্যামেজ ইজ নাউ ফাইনালি ডান।

আজকে পুলিশের এডিসি বাবুল আক্তারের নিরপরাধ স্ত্রীকে হত্যার সাথে এই ড্যামেজের সম্পর্ক আছে।

আমি কখনো এসপি বাবুল আক্তারের নাম শুনিনি। বাংলাদেশের জঙ্গি দমনের যে বয়ান আছে, সেইটার চিন্তা, প্রক্রিয়া এবং উদ্দেশ্য নিয়ে কিছু মৌলিক প্রশ্ন আমার আছে। তাই জঙ্গি দমন করতে গিয়ে কে হিরো হয়েছে, কে জিরো হয়েছে সেই গুলো জানার আগ্রহ কখনোই ছিলনা।

এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রীর নির্মম হত্যার পরে প্রথমেই জঙ্গিদেরকে দায়ী করার মাধ্যমে, ঘটনটার অব্জেক্টিভ তদন্তের সুযোগ নষ্ট করার যে যুক্তি সেই দিকেও আমি যাবো না। আমার প্রশ্ন, পুলিশ বাহিনীর একজন এসপি বা এডিসি বাবুল আক্তার হিরো হয়ে উঠা এবং সেই প্রক্রিয়ার প্রাতিষ্ঠানিকিকরনের ব্যক্তিগত এবং রাষ্ট্রীয় করুন পরিনতি নিয়ে।

অনেক দেশে যাইনি কিন্ত, অল্প যে কয়েকটি দেশে গিয়ে আইনের শাসন দেখেছি, সেই খানে কোন পুলিশ অফিসার বাবুল আক্তারের দাবাং এর মত সালমান খান, বা জঙ্গি দমনের পাব্লিক হিরো ওয়ার সুযোগ নাই। বলার অপেক্ষা রাখেনা, বিডিআর হত্যায় নিহত কর্নেল গুলজারকে হিরো বানানো নিয়েও আমার এই আপত্তি বহাল।

একটা আদর্শ রাষ্ট্রের একজন পুলিশ একজন নৈর্ব্যক্তিক মানুষ। সে যখন কর্মক্ষেত্রে পাব্লিককে ফেস করবে- ঐ সময়ে তখন জাস্ট চিহ্নিত করার প্রয়োজন বাদে তার কোন নাম থাকতে পারেনা। কোন র‍্যাঙ্ক থাকতে পারেনা। পরিচয় থাকতে পারেনা। পারফর্মেন্সের ভালো খারাপ থাকতে পারেনা। মতামত থাকতে পারেনা। রাজনৈতিক, ধর্মীয় চেতনা থাকতে পারেনা। সে কারো বাবা নয়, কারো ছেলে নয়। তার কোন ধর্ম নাই। কোন বর্ণ নাই। কোন গোত্র নাই। সে জাস্ট একজন পুলিশ। জাস্ট একটা ইউনিফর্ম। একটা নাম্বার এবং ডাকার জন্যে একটা নাম।

যুদ্ধের ময়দানে বা অপারেশনে যখন কোন বাহিনী মুভ করে, অফিসাররা সবাই র‍্যাঙ্ক খুলে ফেলে, নেম ট্যাগ খুলে ফেলে । কারন, র‍্যাঙ্ক বা নাম দেখলেই শত্রু চিনে নেবে সিদ্ধান্ত কে নিচ্ছে। ফলে সে আগে টার্গেট হবে। খুব কমন সেন্স ডিসিশান। পুলিশের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য ।

বাংলাদেশের পুলিশের কোন অফিসার যদি জঙ্গি দমনে যায় অথবা সন্ত্রাসী দমনে যায় সেই খানে, তার সাফল্য ব্যর্থতা থেকে কোন হিরো বা ভিলেন নির্মাণ হতে পারেনা। সাফল্য বা ব্যর্থতার পুরো দায় বাহিনীর এখানে ব্যক্তির কোন পরিচয় থাকতে পারেনা।

অবশ্যই হতে পারে, অসাধারণ একজন অফিসার তার অসাধারণ কর্মের মাধ্যমে ফরস কাপিয়ে দিয়েছে। জঙ্গি দমন, অপরাধী দমনে ব্যাপক সাফল্য পেয়ছে। সেইটা হলে সেই কর্মকর্তার প্রমোশন আগে হবে, সম্মান বেশী পাবে। কিন্ত, সেইটা হতে হবে সম্পূর্ণ আন্তঃবাহিনীর ইস্যু। সেইটার কোন পাব্লিক ফেস থাকতে পারেনা। সেইটা নিয়ে হিরো নির্মাণ করতে কোন পেপার রিপোর্ট হতে পারেনা।

এর দুইটি রিস্ক। এক, পাব্লিকের কাছে একজন পুলিশ হবে, পুলিশ। সেইখানে পাব্লিকের মনে যদি ধারনা হয়, তাকে সারভিস পেতে একজন বাবুল আক্তার লাগবে। নইলে সে সারভিস পাবেনা তখন সেই বাহিনী ভেঙ্গে পড়বে।

একটা বাহিনীর গুরুত্বপুর্ণ কোন পদে, একজন বাবুল আক্তার থাকতে পারে, হাবুল সেন থাকতে পারে, কাবুল ইসলাম থাকতে পারে। কিন্ত জনগণের কাছে তার কোন পরিচয় থাকার কথা না। জনগণের কাছে পরিচয় থাকবে শুধু একটা ইউনিফরমের্‌ যেই ইউনিফর্মের পেছনে কে সেইটা সম্পূর্ণ গুরুত্বপুর্ণ।

অন্য দিকে, প্রফেশনালিজম বাদ দিয়ে হিরোইজম বা দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে যদি পারফর্মেন্স বিচার হয়, তবে একটা ইউনিফর্ম বাহিনীর সব চেয়ে প্রয়োজনীয় যে উপাদান- শৃঙ্খলা- তা ভেঙ্গে পড়বে। এবং সেই বাহিনী তার নির্ধারিত কর্তব্য সম্পন্ন করতে পারবেনা। এইটা একটা ক্লাস টু এর বাচ্চারও বোঝার কথা। কিন্ত, আমাদের শীর্ষ নেতারা, বাহিনীর প্রধানেরা এইটা বুঝতে পারছেন না।

এই প্রফেশনালিজমকে বাদ দিয়ে, আমরা যেই ভাবে, দাবাং এর সালমান খানের মত হিরো অফিসার গড়ে তুলছি তার করুন পরিনতি, র‍্যাব প্রধান বেনজির এবং এডিসি বাবুলের নিরপরাধ স্ত্রীর ।

একজন নিজের ইউনিফর্মের নৈর্ব্যাক্তিকতাকে ভুলে, একটা হামবাগ হয়ে পাব্লিকের সামনে এসে তার ইউনিফর্মকে অশ্রদ্ধা করে এবং ফোরসের মধ্যে সকল ধরনের ডিসসিপ্লিনকে ধ্বংস করে, আরেক জন, তার হিরো স্বামীর ভালো কাজ বা খারাপ কাজের দায়ে নিহত হয়, কোন অপরাধ ছাড়াই।

একটা দেশ সিনেমা না। একটা বাহিনীর কাজ কোন বলিউডের স্ক্রিপ্ট না। একটা দেশকে আগাতে হলে, সম্পূর্ণ বিরাজনৈতিক এবং নৈর্ব্যক্তিক জন প্রশাসন, পুলিশ এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কোন বিকল্প নাই। এই বাহিনীর কোন মতামত থাকতে পারেনা। কোন ধরনের রাজনৈতিক ধর্মীয় চেতনা থাকতে পারেনা। তার একটাই জিনিষ থাকবে, সেইটা হলো, এসওপি। স্ট্যান্ডিং অর্ডার প্রসিডিউর এবং সেই এসওপির প্রক্রিয়ার প্রতি অন্ধ আনুগত্য।

এই পথে না আগালে, চোর , ডাকাত, বাবু, পুলিশ কারো রেহাই নাই। যদি আমরা এই পথে না আগাই তবে, কোন দিন সাফার করবে বিরোধী দলের নেতা, কোন দিন ব্লগার, কোন দিন ইউনিভারসিটি শিক্ষক এবং কোন দিন পুলিশ অফিসার বাবুল আক্তারের নিরপরাধ হিজাবি স্ত্রী।

আজকের দিনটা বাবুল আক্তারের পরিবার দায় নিল। কাল আপনার বা আমার পরিবার নেবে।



জিয়া হাসান
লেখক: অন্তর্জাল.কম