"/> অন্তর্জাল

স্বৈরাচারী বন্দুকবাহিনীর আরেকটি ২৭ নভেম্বর!
সৌমিত জয়দ্বীপ -11/27/2016





জ শহীদ ডা. মিলন দিবস, ১৯৯০ সালে যাঁকে হত্যা করেছিল স্বৈরাচার এরশাদের বন্দুকবাহিনী। রাষ্ট্র আরও একটা ২৭ নভেম্বরের জন্ম দিল। রাষ্ট্রের গুলিতে আরও একবার রঞ্জিত হলো ২৭ নভেম্বরের রাজপথ। এবার নিহত হলেন শিক্ষক, নিহত হলেন একজন খেঁটে খাওয়া মানুষ।

ঘটনা হলো, ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া ডিগ্রী কলেজকে জাতীয়করণের দাবিতে আন্দোলন করছেন শিক্ষকরা। আন্দোলন তো হতেই পারে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় সেই আন্দোলনে পুলিশ গুলি চালিয়েছে। পুলিশের গুলিতে ফুলবাড়ীয়া ডিগ্রী কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ (৪৫) ও পথচারী স্থানীয় কুশমাইল কড়ইতলার ছফর আলী (৫৫) নিহত হয়েছেন। আহত কী পরিমাণ লোক হয়েছেন, সেটা আন্দাজ করে নিন।
 

“নিজের দলের নেতা ডা. শামসুল আলম খান মিলন হত্যাকাণ্ডের জন্য যাকে দায়ী করা হয়, সেই এইচ এম এরশাদের সঙ্গে জোট গড়ার পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেছে, সামরিক একনায়কের গড়া দলটি এখন গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরেছে।”
-মাসুদ রানা


যে বাংলাদেশের জন্ম একটি মহা আন্দোলনের ফসল, সেই বাংলাদেশে দাবি আদায়ে আন্দোলন করতে গিয়ে শিক্ষক নিহত হন, নির্যাতিত হন; গর্ভবতী নার্সের পেটে লাথি মেরে তার স্বপ্নের অনাগত সন্তানকে নষ্ট করা হয়, আদিবাসী সাঁওতালদের পাখির মতো মারা হয় এবং আরও নানা ঘটনায় রাষ্ট্র ও তার লাঠিয়াল বন্দুকবাহিনী শুধুই নিপীড়ক হয়ে ওঠে।

আমরা কি সত্যই এমন স্বৈরাচারী রাষ্ট্র চেয়েছিলাম, যেখানে কথা বললেই, রাজপথে নামলেই ধেয়ে আসে উদ্ধত বেয়নেট, বুট, বন্দুক, লাঠি, গুলি, জলকামান, টিয়ারগ্যাস! এই রাষ্ট্রের সঙ্গে আইয়ুব কিংবা এরশাদের রাষ্ট্রের পার্থক্য কোথায় বলতে পারেন?

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ নিয়ে সারা বছরই কোন না কোনভাবে শিক্ষকরা কথা বলেন। মনে পড়ে কি, দুই-এক বছর আগে শহীদ মিনারে জলকামান দিয়ে আজিজুর রহমান নামের একজন প্রাইমারি শিক্ষককে মেরে ফেলা হয়েছিল? আজ আরও একজন শিক্ষক নিহত হলেন!

বিস্মিত হই! লজ্জিত হই! শিক্ষকের গায়ে পুলিশের হাত পড়ে এই দেশে! অপমানিত হই, সাংসদে তর্জনীর নির্দেশে সম্পূর্ণ সাম্প্রদায়িক কারণে শিক্ষককে কান ধরে উঠবস করতে হয়! হায় আমার বাংলাদেশ!

বলুন তো, কেন প্রায় প্রতিবছরই কোন না কোন পর্যায়ের শিক্ষকদের মাঠে নামতে হয়? কারণ আর কিছু না, আর্থিক নিরাপত্তা। কত টাকাইবা বেতন পান শিক্ষকরা? পাশের দেশের কত বদনাম আমরা করি, অথচ, নিজে দেখছি এখানে শিক্ষকরা কত সম্মানিত। শিক্ষকদের বেতনও এখানে সর্বাধিক। বাংলাদেশে, বিশেষত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা বলে কিছু আছে বলে মনে হয়? কেন তাদের ফি বছর রাস্তায় নামতে হয়, আমরা কি সেটা কখনও ভাবি? আচ্ছা, এই যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ প্রক্রিয়া চলছে, এটাও কি যথার্থ স্বচ্ছতার ভিত্তিতে হচ্ছে বলে মনে হয়?

প্রশ্ন অনেক, উত্তর কে দেবে! উত্তরদাতারা তো বন্দুকবাজিতে ব্যস্ত! পুরো দেশটাকে তারা একটা ক্যান্টনমেন্ট বানিয়ে রেখেছে!

এই বাংলাদেশ পচে যাচ্ছে দিনকে দিন। এই বাংলাদেশে গণতন্ত্র বলে আর কিছুই নেই।

অসংখ্য গুণী শিক্ষকের ছাত্র হিসেবে আমি অস্বস্তি বোধ করছি। একজন প্রয়াত শিক্ষকের সন্তান হিসেবে আমি প্রচণ্ড আহত বোধ করছি। আমি কোথায় যেন মরে পড়ে থাকা একজন অসহায় পিতার লাশ দেখতে পাচ্ছি!

হায় আমার বাংলাদেশ! হৃদয়ের রক্তক্ষরণ সবচেয়ে বড় রক্তক্ষরণ-- সে তুমি কোনদিনও বুঝবে না হে লেফট-রাইট-লেফট করা রাষ্ট্র!



সৌমিত জয়দ্বীপ
জন্ম: জুন ১৮
লেখক, গবেষক ও সংবাদকর্মী