"/> অন্তর্জাল
পথঘাট
গুলিস্তান ছিলো তখন দুনিয়ার সবচেয়ে খারাপ জায়গা
শোয়েব সর্বনাম -11/11/2016





ক্লাস সেভেনে থাকতে চটি বইগুলার লগে পরিচয় ঘটে আমার। সেইগুলা ছিল সস্তা, নোংরা ও অশ্লীল। গুলিস্তানে কিনতে পাওয়া যাইতো, সেইখান থেকা ব্যাগে কইরা স্কুলে নিয়া আসতো কেউ না কেউ। সাথে থাকতো আজাদ প্রোডাক্টসের পকেট ক্যালেন্ডার। এক সাইডে ক্যালেন্ডার, আরেক সাইডে অর্ধনগ্ন পামেলা এন্ডারসন ও অন্যান্যদের ছবি। সেইগুলা ততটা অশ্লীল ছিল না, কামনা উদ্রেক করা ছবি। সালমান শাহের পোস্টারের নীচে থাকতো এইগুলা, কমবয়সী ছেলেরা সেইদিকে গেলে তারা পোস্টার উল্টাইয়া দেখাইতো। এক টাকায় দুইটা কইরা কিনতে হইতো তখন।
গুলিস্তান ছিলো তখন দুনিয়ার সবচেয়ে খারাপ জায়গা। আমার সেইখানে যাইতে ভালো লাগতো না। তাছাড়া, আমার কোমলমতি কৈশর তখন পর্যন্ত চটি বইগুলার হার্ডকোর ভালগারিজম নিতে পারতো না। ফলে, একসময় নিজেই চটি লেখা শুরু করলাম আমি। সেইগুলা রুচিশীল হইতো বইলা আমি ভাবতাম। বাট, কিছুদিন এইরকম লেখার পর আমি চটি বিষয়ে সকল আগ্রহ হারাইয়া ফেলি। আর, ততদিনে ভিএইচএস ক্যাসেটে এইসব ভিডিও পাওয়া যায় বইলা আমরা খবর পাই। এইরকম এক ছুটির দিনে, এক বন্ধুর বাড়িতে আমরা উত্তেজনার সাথে দরজা লাগাইয়া জীবনের প্রথমবারের মতো ব্লুফিল্ম দেখতে বসি। ব্যাপারটা আমার কাছে ছিল অত্যন্ত বিস্ময়ের। ব্লু ফিল্মের অভিনেতাদের আমার খুব বেশরম বইলা মনে হইতেছিল। এক পর্যায়ে, আমার এক বন্ধু বাথরুমে গিয়া বমি করতে থাকে। সেই ধারাবাহিকতায়, আমরা সকলেই সেইদিন একযোগে বমি কইরা ভাসায়া ফেলছিলাম।
তার পরের সপ্তাহে আরেক বন্ধুর প্ররোচনায় আমার আমরা একই কর্মে লিপ্ত হই। প্ররোচনাকারী বলতেছিলো, আগেরটা কাবজাব হইছিল। এইটা বেটার। ফলে, আমরা আবার একযোগে বেটার ব্লুফিল্ম দেখতে বসি। সেই ছবিটা দেখতে গিয়াই আমরা টের পাই যে, ব্লু ফিল্মেরও ভালো খারাপ আছে। তার পরের বছর ঢাকার মধুমিতায় টাইটানিক সিনেমাটা রিলিজ হয়। টাইটানিকের যুগে আমাদের ঘরে ঘরে কম্পিউটার প্রবেশ করে। ভিএইচএস এর দোকানগুলা ততদিনে সিডির দোকান হিসেবে আত্নপ্রকাশ করে। আমাদের মধ্যে কে জানি কম্পিটারের হার্ড ডিস্ক খুইলা আরেকজনের কম্পিউটারে লাগায়া ফেলতে পারতো। পরে আমরা সকলেই এই কাজে খুব এক্সপার্ট হইয়া যাই। ২০ জিবি হার্ড ডিস্কে সেই আমলে প্রায় ১০ জিবি আমি এই উপায়ে সংগ্রহ করতে সমর্থ হইছিলাম। তার মধ্যে অন্যতম ছবিটার নাম ছিল হোলি স্মোক। টাইটানিকের নায়িকারে নিয়া বানানো খারাপ রেটেড ছবি।
তখন ইন্টারনেট এমন ছিল না। তবুও আমরা সেইসময়ের একজন জনপ্রিয় টিভি সেলিব্রেটির পর্ণ বাজারে আসছে বইলা খবর পাই। একদিন বিকালের দিকে আমরা তিন বন্ধু সাহস কইরা আবার গুলিস্তান অভিমুখে রওনা দেই, এবং সেই সেলিব্রেটির পর্ণ নিয়া ফিরত আসি। সেইদিন থেকে আবার আমাদের গুলিস্তানযাত্রা শুরু হয়। তার পরপরই আমরা একটেল-সুমন হাতে পাই। একটা সময় পর্যন্ত সেইটাই ছিলো সবচেয়ে জনপ্রিয় দেশী পর্ণ। সুমন নামের টাকলা এক লোক ক্লোজেটের ভিতরে ক্যামেরা রাইখা মেয়েদের অজান্তে ওইসব করার সময় ভিডিও কইরা ফেলছিল। অনেকগুলা মেয়ের লগেই সে এইরকম ফুটেজ নিয়া রাখছিলো। প্রতি ৪ টা ভিডিও দিয়া একটা কইরা সিডি বানায়া তখন গুলিস্তানে বিক্রি হইতো। সেই মেয়েদের মধ্যে একটা মেয়ে একটেল কোম্পানীর কাস্টমার কেয়ারে চাকরি করতো বইলা সেইসব সিডির নাম হইছিল একটেল-সুমন।
যৌবনের শুরুতে টেকনোলজি আমাদের জন্য প্রতি পদে পদে যৌনতার উপাদান হাজির করতে থাকতো। তবু আমরা তখন পর্যন্ত নারীদেরকে নোংরা চোখে দেখতে শুরু করি নাই। আমাদের বান্ধবীরা আমাদের থেকে সিডি নিয়া যাইতো, আমরা কখনোও মেয়েদেরকে খারাপ চোখে দেখা যায় এমন ভাবি নাই। আজকে পর্যন্ত প্রায় সকল বান্ধবীর লগেই আমাদের সম্পর্ক অটুট আছে। কিছুদিন আগে এক গেট টুগেদারে এইসব নিয়া খুব হাসাহাসিও হইছে নিজেদের মধ্যে। একবার, এক ঈদের পরের দিন, এক বান্ধবীর বাসার কম্পিউটারে আমরা দল বাইন্ধা এইসব দেখতে গিয়া ধরা খাইছিলাম। ঝামেলার একশেষ। এরপর মাসখানেক তার ঘর থেকা বাইর হওয়া বন্ধ। সেইসময় খবর পাওয়া গেলো, একটেল-সুমনের এক বান্ধবী নাকি ভিডিও দেইখা সুইসাইড করছে। সেইটা জানার পর আমাদের মধ্যে খুব অপরাধবোধ হইলো। এরপর থেকা আমরা আর কখনো গুলিস্তানে যাই নাই।
নারীদেরকে নোংরা চোখে দেখার হাতে খড়ি হইছিলো আমার প্রথমবারের মতো গ্রামে গিয়া। আমাদের গ্রাম, মানে আমার দাদার বাড়ি, তখনো গন্ডগ্রাম। ইলেকট্রিসিটি নাই। জীবনে প্রথম সেই গ্রামে গেছি আমি ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়া তারপরে। একদিন দেখি, গ্রামের ছেলেরা সন্ধ্যার পর পর প্রাইমারী স্কুলের মাঠে ক্লাসরুমের সবগুলা বেঞ্চি বাইর কইরা নিয়া আসছে। সেই বেঞ্চে বইসা সারারাত ছবি দেখা হবে। চাঁদা ঠিক করা হইলো হইলো পারহেড ১৫ টাকা। মাঠের এক মাথায় ভাড়া কইরা আনা হইছে একটা ১৪ ইঞ্চি টেলিভিশন আর সিডি প্লেয়ার। লুকাস ব্যাটারি দিয়া সেই টিভি চালানো হইতো। প্রথম পর্যায়ে ছাড়া হইছিলো রাজ্জাক শাবানামূলক ছবি। তারপরে ইন্ডিয়ান বাংলা। দ্বিতীয় পর্যায়ে হিন্দি ছবির ভালগার নাচের দৃশ্যগুলার সময়ে লোকেরা নানান অশ্লীল কমেন্ট করতে করতে পুরাটা ছবি দেখলো। সেই কমেন্টগুলা ভুলতে আমার অনেক সময় লাগছে। ততদিন পর্যন্ত আমি আর পর্ণ তো দূরের কথা, এভারেজ সিনেমাও দেখতে পারতাম না।
যৌনতাকে যৌনতা হিসেবেই দেখার কথা। পর্নোগ্রাফিতে কারও অবমাননা হইলে নারী পুরুষ উভয়েরই হবে। একটা পর্ণোগ্রাফি প্রকাশ হইলেই যারা বলতে থাকলেন মেয়েটা কত খারাপ, সেইটা তাদের দেখার সমস্যা। চোখের সমস্যা। মাথার সমস্যা। আরেকদল সহানুভূতিশীল ভাবতে থাকে, আহারে, মেয়েটা যেন ভিকটিম। তার সর্বনাশ কইরা দেয়া হইছে। সেইটা সহানুভূতিশীলদের ভাবনার সমস্যা। মেয়েরাও গোপন ক্যামেরায় পর্নোগ্রাফি কইরা অনলাইনে পাবলিশ করতে পারে, এমনকি করেও, চোখের সামনে হাজারটা উদাহরন আছে।
ফলে, উপভোগ করতে পারলে দেখেন, নাইলে এভয়েড করেন। সহানুভূতির চোখে পর্ণ দেখলে হবে না। যৌনতার চোখে দেখতে হবে। পর্ণ যখন পাবলিশ হয়, তখন সেইটা আর কারও ব্যক্তিগত মুহুর্ত থাকে না। তখন সেইটা নৈব্যক্তিক। সারা দুনিয়াতে পর্ণস্টাররা সেলিব্রেটি। পৃথিবীর অনেক দেশের বাৎসরিক বাজেটের প্রধান অংশ আসে আসে পর্ণ ইন্ডাস্ট্রি থেকে। ইন্টারনেটের সবচেয়ে বেশি ওয়েবসাইট পর্ণোগ্রাফি। বাংলাদেশের নব্বই ভাগ নিউজপোর্টালের রেমিটেন্স আসে যেই হিট থেকে, সেই হিটগুলা অলমোস্ট ভালগার আইটেম।
ফিল্ম এপ্রিসিয়েশন বইলা একটা ব্যাপার আছে। পর্নোগ্রাফি এপ্রিসিয়েশনের ব্যাপার। নিন্দার নয়।



শোয়েব সর্বনাম
জন্ম: ২৩ ফেব